সুন্দরবনের পর্যটনকেন্দ্র সমূহ

  • Ratul Islam 578 13/10/2018

প্রকৃতির এক অপার রহস্য বুকে নিয়ে বঙ্গোপসাগরের কূলঘেষে ঠায় দাড়িয়ে আছে হাজার বছরের বন সুন্দরী। মূলত এখানকার সুন্দরী গাছের নামেই এর নাম সুন্দরবন। সুন্দরবনের বাঁকে বাঁকে বয়ে চলেছে কতো নদী তাদের আবার রহস্যময় সুন্দর-সুন্দর নাম। নদী আর বন মিলিয়ে যেমন দিয়েছে স্থানীয় ও আশপাশের মানুষের জীবর জীবিকার আধার তেমনি পানি কুমির আর বাঘ মিলে প্রাণ নিয়েছে কতো জানা অজানা মানুষের। আজকের সুন্দরবন সুন্দরের ডালা বিছিয়েছে প্রকৃতিপ্রেমী মানুষদের জন্য। সুন্দরের পসরা সাজিয়ে বসেছে ঘাটে ঘাটে। প্রকৃতির প্রেমিকেরা তার রুপদেখার তৃষ্ণা মেটায় সুন্দরবনের রুপমার্ধূর্য দেখে। জীবন ও প্রকৃতির গভীর মিতালী যেন শিল্পীর আঁকা ছবি কিংবা ছন্দে বাঁধা কোনো কবিতা। এখানে বন-বনানী কথা বলে প্রেমিক আগন্তুকের সাথে। নদীরবুকে কুলু কুলু শব্দতুলে বনের গভীরে হারিয়ে যায় প্রকৃতির পেম ভিখারিরা। আসুন আজ তবে আমরা জেনে নিই সুন্দরবনের বিভিন্ন ট্যুরিস্ট পয়েন্টে সম্পর্কে।

করমজল

করমজল মংলা থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে পশুর নদীর তীরে অবস্থিত। এখানে রয়েছে কুমির, হরিণ, বানর সহ নানা প্রজাতির পশুপাখি। কাঠের ট্রেইল ও টাওয়ারসহ এখানে রয়েছে দেশের একমাত্র কুমিরের প্রাকৃতিক প্রজনন কেন্দ্র। আছে হরিণ প্রজনন কেন্দ্র এবং পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। এখানে কুমিরের বাচ্চা আর অসংখ্য বানর দেখতে পাবেন। মাটিতে দৌড়ে বেড়াবে লাল কাঁকড়া। নদীর ঢেউ এসে পাড় ভেঙ্গে পড়বে ম্যানগ্রোভ শেকড় রাশির গায়ে। মজার ব্যাপার হলো মিষ্টি পানির জন্য এখানে তিনটি পুকুর রয়েছে।

কটকা

সুন্দরবণ পুর্ব অভয়ারন্যের পশ্চিমাংশে সাগরের কোল ঘেষে অবস্থিত কটকা অভয়ারণ্য। এখানে নৈসর্গিক পরিবেশ ঘন বনানীর ছায়ায় নির্মিত বিশ্রামাগার থেকে উপভোগ করা যায় উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ। বিকেলে সূর্যের আলো পড়ে গেলে হরিনেরা চলে আসে কাছাকাছি। বানরের দলেরতো আর রাতদিন নেই! হয়তো দেখে ফেলতে পারেন নদীর পাড়ে কুমিরের রোদ পোহানোর দৃশ্য। কটকা টাইগার এর বিচরণ এলাকার মধ্যে পড়লেও বাঘের সংখ্যা এতই কমেছে যে, বাঘ দেখতে পাওয়া কেবল ভাগ্যের উপর। বন দেখার জন্য এখানে আছে পর্যক্ষেন টাওয়ার আর থাকার জন্য আছে ৪বেডের একটি রেস্ট হাউস। কটকা থেকে মংলা হতে প্রায় ১১২ কিঃমিঃ। সময় লাগে প্রায় ৮ ঘন্টা থেকে ১০ ঘন্টা। জামতলা কটকার কাছেই জামতলা। কটকা খাল পার হয়ে ছোট একটি খালের পাড়েই এর অবস্থান। পর্যটকদের আকর্ষনের জন্য এখানে একটি ওয়াইল্ড লাইফ ওয়াচ টাওয়ার নির্মিত হয়েছে। টাওয়ার থেকে দেখাযায় হরিণের পাল। কখনো বাঘের ভয় বা অন্যকোনো কারণে ভিত হলে মুহুর্তে হারিয়ে যায় গভীর বনে। জামতলা খালটি প্রায় ১ কিঃমিঃ লম্বা তাই ছোট নৌকায় উপভোগ করা যায়। তবে কুমিরের ভয়ও আছে। কচিখালী সুন্দরবণ পুর্ব অভয়ারন্যের পুর্ব দক্ষিন প্রান্তে সাগর তীর ঘেষে সারি সারি তালগাছ আর নারিকেল বাগান নিয়ে গড়ে উঠেছে কচিখালী সাথে আছে একটি মনোরম বিশ্রামাগার। এতে এক শয্যা বিশিষ্ট ৩টি ও ২ শয্যা বিশিষ্ট ১টি কক্ষ এবং ড্রইং ও ডাইনিং রুম রয়েছে। এখানে পর্যটকেরা আসে বাঘ দেখার আশায়। তবে আজকাল লোকালয়ের এতকাছে বাঘ মেলা ভার। কাশবনের সাদা ফুলের বাঁকে যদি কখনো হরিণ শিকারের আশায় লুকিয়ে থাকে মংলা হতে কচিখালীর দুরত্ব ১০৬ কিঃ মিঃ। কচিখালীতে অক্টোবর হতে মার্চ পর্যন্ত মৌসুমী মাছের হাট বসে।

বাদামতলা

কচিখালী আর কটকার মাঝামাঝি বাদামতলা। বাদামতলা সৈকত অত্যন্ত নির্জন মনোরম কিছুটা ভয়ংকরও বলা যায়। শীতকালে এ সৈকতে বাঘ দেখার সম্ভাবনা থাকে, অন্তত বাঘের পায়ের ছাপতো দেখা যায়। আরেকটি বিষয় হলো এখানে জামতলা বা কচিখালী থেকে পাঁয়ে হেঁটে যাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে ঝুকি আছে, তবে নিয়ম মেনে সতর্ক থেকে যাওয়া যেতে পারে। শীত মওসুমে এখানে শন সংগ্রহের জন্য স্থানীয় বনজীবি মানুষেরা আসেন। তিনকোনা দ্বীপ তিনকোণা দ্বীপ সুন্দরবনের ভ্রমনেচ্ছুদের কাছে নতুন করে পরিচিত হয়ে উঠেছে। পশুর ও মরা পশুর নদীর সংগম স্থলে অবস্থিত এ স্থানে হরিণ বানরের দেখা মিলবে। অনেকে এখানে বাঘের দেখা পেতেও আসেন। তিনকোণা দ্বীপের কাছে কোকিলমনি নামক স্থানে বন বিভাগের একটি টহল ফাঁড়ি রয়েছে। দুবলার চর ভ্রমনকারীরা কখনো কখনো এখানে যাত্রাবিরতি করে থাকেন। দুবলার চর এটি তুষারশুভ্র কাশফুল আর সবুজ ঘাষে ঢাকা সমুদ্রের কোল ঘেষে অবস্থিত। এখানে জেলেরা বছরের ছয় মাস অবস্থান করে দেশী ছোট নৌকায় জীবনের ঝুকি নিয়ে সাগরে মাছ ধরতে যায়। এই জেলে পল্লীতে জেলেদের অবসর সময় অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সমূহ খুবই উপভোগ্য। পর্যটকেরা এখানে শুটকি প্রক্রিয়াকরণ সচক্ষে দেখেন। সাথে খুব কাছ থেকে দেখতে পারেন জেলে পাড়ার জীবন। এই স্থানটি রাসমেলার জন্য বিখ্যাত। মংলা হতে দুবলার চর ৯০ কিঃ মিঃ দুরত্ব। এখানে জনবসতি থাকার কারণে ৪টি সাইক্লোন সেন্টার ও কটি মিঠা পানির পুকুর রয়েছে। বর্ষায় দুবলার চর থেকে ইলিশ পাওয়া যায়। কার্তিক মাসের রাশ পুর্নিমার মেলায় দুর-দুরান্ত থেকে হাজার হাজার তীর্থ যাত্রীর আগমন ঘটে রাস মেলায়। রাস মেলাটি ৩ দিন ধরে চলে।

মান্দারবাড়িয়া

সুন্দরবনের অভ্যন্তরে ভ্রমনের জন্য যে সব গুরুত্বপূর্ণ ও মনোরম স্থান রয়েছে মান্দারবাড়িয়া অন্যতম এবং বাঘ দেখতে পাওয়ার জন্য এই স্থানটি পরিচিতি। সুন্দরবনের পশ্চিমে দক্ষিণ অংশে বঙ্গোপসাগরের কুল ঘেঁষে এখানে সুর্য উঠা ও অস্ত যাওয়ার দৃশ্য পর্যটকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। মান্দারবাড়িয়ার সন্নিকটেই রয়েছে পটণী আইল্যান্ড, দুর থেকে দেখলে মনে হয় যেন বঙ্গোপসাগরে এক খন্ড সবুজ পাথর ভাসছে। টাইগার, হরিণ, বানর, কচ্ছপ, সাপ, কাঁকড়া, কুমির আর পাখিতো আছেই। আর বুনো নিরব মনোরম সমুদ্র সৈকততো শীতে কচ্ছপের রৌদ্র স্নান দেখার সুযোগ মিলতে পারে। হিরণ পয়েন্ট বা নীলকমল সাগরের বেলাভূমি ঘেষে সন্নিকটে নদীর দক্ষিন বনে মনোরম নীলকমল অভয়ারণ্য। এখানে আছে নীল রং শোভিত অভয়ারণ্য কেন্দ্রের অফিস গৃহ, বনকর্মীদের বাসগৃহ, পিকনিক স্পট। নীলকমল খালের নাম অনুসারে এ স্থানটির নাম রাখা হয়েছে নীলকমল। এমাঠে সকালবেলা হরিণের দেখা মেলে। এখানকার পুকুরে পানি খেতে আসে তারা। এখানেও একটি টাওয়ার আছে। এখানকার নদীতে কুমিরের দেখা মিলতে পারে যেকোনো সময়। খুলনা হতে হিরণ পয়েন্ট এর দুরত্ব প্রায় ১২০ কিঃ মিঃ।

শেখেরটেক

এখানে প্রায় ৪০০ বছরের পুরাতন একটি মন্দির, শেখেরবাড়ীর ধবংসাবশেষ এবং কিছু উঁচু জায়গায় ঘরবাড়ীর চিহ্ন পাওয়া যায়। শিবসা নদীর তীরে বনের মধ্যে শেখেরটেক মন্দিরটি অবস্থিত যা ছোট ছোট ইট, চুন ও সুরকীর গাথুনী দিয়ে তৈরী। এটা নিয়ে নানা গল্প প্রচলিত আছে।

হাড়বাড়িয়া

সুন্দরবন দেখে দিনে দিনে ফিরে আসার জন্য হাড়বাড়িয়া একটি উৎকৃষ্টট্যুরিষ্টস্পটহয়েগড়ে উঠেছে। মংলা থেকে ট্রলার যোগে হাড়বাড়িয়া যেতে সময় লাগে ২ থেকে ৩ ঘন্টা। পশুর নদী ও হাড়বাড়িয়া খালের সংগম স্থলে হাড়বাড়িয়া টহল ফাঁড়ির নিকটে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য কিছু কিছু স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু আইল্যান্ড

বঙ্গবন্ধু দ্বীপ সুন্দরবনের সর্বশেষ পয়েন্ট পুটনী আইল্যাণ্ডের আগে। নির্জন দ্বীপের প্রশস্ত সমূদ্র সৈকত আপনার মন ভরাবে। এখানে কাশবন অল্পকিছু গাছ রয়েছে। রয়েছে হরিণ। বাঘেরা এখনো সেখানে যায়নি। ভবিষ্যতে একটি আকর্ষনীয় পর্যটনকেন্দ্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ পুটনি দ্বীপ আর বঙ্গবন্ধু দ্বীপ এই দুটো দ্বীপে রয়েছে প্রশস্থ ও পরিচ্ছন্ন বালুকাবেলা। একজন জেলে এই দ্বীপের নাম রাখেন বঙ্গবন্ধু আইল্যান্ড।

খালপেটুয়া:

সুন্দরবনের পাড় ঘেষে আর খোলপেটুয়া নদীর পাশ ধরে চলতে থাকলে হরিণ, বানর এর দেখা মিলবে। খোলপেটুয়া নদী এই অঞ্চলের মানুষকে দিয়েছে প্রতিদিনের জীবিকা। এই নদীতে প্রায় সারা বছরই মাছ ধরে স্থানীয় মানুষ। এই নদীতে সারা বছর ধরেই কাঁকড়া পাওয়া যায়। এছাড়া, রামসার, মুন্সীগঞ্জ, কপিলমনি, টিয়ার চর, শেলার চর, ঢাংমারী, জোংড়া, মরা পশুর, ঘাগড়ামারী, লাউডোব, জ্ঞানপাড়া, চাঁদপাই, নন্দবালা, চরাপুটিয়া, মৃগামারী, জিউধারা, বড়ইতলা, আমুরবুনিয়া, শুয়ারমারা, ধানসাগর, গুলিসাখালী ইত্যাদি পয়েন্টে এডভেঞ্চারপ্রিয় পর্যটকেরা গিয়ে থাকেন।

লেখা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন, ছবি: ইন্টারনেট