সুন্দরবনের যতো রহস্য

  • Ratul Islam 494 10/10/2018

বিশাল সমুদ্রযেন  খাবি খায়,সুন্দরী গরান গেওয়া কেওড়া আর গোলপাতার পায়ে হাজার বছর ধরে ঠায় দাড়িয়ে রুপসী সুন্দরবন যেন কোনো এক কাংখিত প্রেমিকের পথ চেয়ে বসেআছে। অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হওয়াতে প্রকৃতির এই নন্দিনী যেন শেকড় গেড়ে বসেছে বাংলার প্রান্তজুড়ে। নোনা জল,কাদামাটি, ঘন বন, আঁকাবাঁকা নদী আর অসংখ্যা খাঁড়ি খাল বেয়েযেন নেমে আসে মানুষ আর প্রকৃতির অমরকাব্য গাঁথা বাঘ মামার বাড়ী হলেও ভয়ঙ্করর তীব্র গতির কুমির, হাঙর, শুশুক, কাঁকড়া, চিত্রা হরিণ, রির্সাস বাঁদর, বুনো শুয়োরমেছোবিড়াল, বেজি, ভোঁদড় শুয়োর আর নানা রকম বিষাক্ত সাপ।

পৃথিবীর সব চাইতে বড় বদ্বীপ এই সুন্দরবন ৪২৬৪ বর্গ কিমি জুড়ে এর বিস্তার এর মধ্যে ২৫৮৫ বর্গ কিমি সুন্দরবন টাইগার রির্জাভ আর পশ্চিম অরণ্যে১৬৭৯ বর্গকিমি বনাধিকারিক২৪পরগনার ৫৬টি বদ্বীপ রয়েছে এই অসাধারন বনাঞ্চলে তা সত্বেও আরো জানা অজানা অনেক রহস্য আছে এই বনকে ঘিরে চলুন জেনে নেয়া যাক সেসব থেকে অল্প কিছু রহস্য।

মামাবাড়ি সুন্দরবন

শুধু মামাবাড়ি নয়, ডাক্তার বাড়ী, নেতা বাড়িও বটে ডাক্তার নেতা এগুলো হচ্ছে সুন্দরবনের জলদস্যুদের প্রতীকী নাম সুন্দরবনের বাঘের যেমন নাম নেয়না স্থানীয় মানুষ, বাঘকে মামাবলে ডাকে তেমনি নাম নিতে বারণ জলদস্যুদের লোকচক্ষুর অন্তরালে লোকসমাজ থেকে ত্যাজ্য কিছু মানুষ সেখানে তৈরী করেছে অপরাধের গোপন সম্রাজ্য ভারী অস্ত্র আরহিংস্রতায় তা যেন বাঘকেও হার মানায় সুন্দরবনের ডাকু মামাদের ইতিহাস কিন্তু আজকের নয় এক সময় পর্তুগিজ জলদস্যুদের অত্যাচারে সুন্দরবনের অনেক সমৃদ্ধশালী জনপদজনশূন্য হয়ে যায়। যদিও বর্তমানে জলদস্যুদের প্রকোপ অনেকটাই কমেছে। এখন পর্যটকেরা নিরাপদেই সুন্দরবন দেখতে যান।

গহীনবনে গোপন শহর

সুন্দরবনে কখনো কখনো দেখা মেলে পুরনো ঘরবাড়ী, মন্দির কিংবা রাজপ্রাসাদের নির্জন বনে নিরালায় এমন রাজপ্রাসাদের ভগ্নাংশ ভয় ধরিয়ে দিতে পারে মুহুর্তে কিন্তু এগুলো ভুতুড়েপ্রাসাদ নয় একেবারে বাস্তব চাইলে হাত দিয়ে ধরে ছুঁয়ে দেখতে পারবেন আর থাকতে হলে লাগবে বনবিভাগের অনুমতি অবশ্য এগুলো বসবাসের উপযোগী নয় মোটেও এর মধ্যে রাজা প্রতাপ্রাদিত্য কিছু দুর্গ বানিয়ে দস্যুদের আটকাবার চেষ্টা করেছেন ১৮৯০ সালে সুন্দরবন সফরকারী এক ইংরেজ সাহেব রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজপুরীর ধ্বংসাবশেষ দেখতে পান।এরকম আরো অনেক কুঠির ভগ্নাংশ আপনাকে ভূতুড়ে কিংবা হারিয়ে যাওয়া বুনো-শহরের কথা মনে করিয়ে দেবে।

বনের নিচে গুপ্তধন:

বনের গাছের নিচে গুপ্তধনের কথা রুপকথার গল্পে শুনেছেন বনে ফোকলা বুড়ো গাছের নিচে পুরনো মুদ্রার কথা পড়েছেন সত্যজিত রায়ের ফেলুদা গল্পে এসবছে ছাপিয়ে আসল সত্যকথা হলো সুন্দর বন ও তার আশপাশের এলাকায় মাটির নিচে মিলছে পুরনো মূল্যবান মূর্তি পশ্চিমবঙ্গ অংশ ঘাটেশ্বরা গ্রামে পুকুর খোঁড়ার সময় একটি আদিনাথের জৈনমূর্তি পাওয়াগিয়েছিল কাঁটাবেনিয়ার রায়মঙ্গল নদী গাঙ থেকে পার্শ্বনাথেরএকটি বৃহৎমূর্তিউদ্ধারহয়করঞ্জলি, পাথরপ্রতিমা, রাক্ষসখালি প্রভৃতি অঞ্চলেও দ্বারফলক, স্তম্ভ, অষ্টধাতুর বুদ্ধমূর্তি ,অন্যান্য পাথরের ও পোড়ামাটির মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে। বনের মধ্যে কখন খনন করা হলে হয়তো বেরিয়ে আসবে আরো নানা মূর্তি, কাঁসা কিংবা মুদ্রার অংশ।

মাটির নিচে সুন্দরবন

ভাবছেন এ আবার কেমন কথা হাঁ আজকের সুন্দরবন মাত্র একশ বছর আগেও ছিলো দ্বিগুন বড়ো হয়তো শতশত বছর আগে এর বিস্তার ছিলো বিশাল তার প্রমাণ এখনো মেলেমাটির নিচে কলকাতার শিয়ালদহের কাছে পুকুর খুঁড়তে গিয়ে ৩০ ফুট নিচে সুন্দরী গাছের অনেক গুড়ি দেখা যায় পশ্চিমবঙ্গে মাতলার কাছে ১০-১২ ফুট মাটি খুঁড়ে দেখা যায়,একাধিক সুন্দরী গাছ কঙ্কালের মতো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শুধু গাছ হয়তো এভাবে মাটির নিচে হারিয়ে গেছে বনসংলগ্ন কোনো লোকালয়, ঘরবাড়ি, মন্দির, মূর্তি, রাজপ্রাসাদ সেসাথে সেখানকার মানুষদের কতনা সুখ দু:খের গল্প।

বনবিবি পাহারা দেয় সুন্দরবন:

বনবিবি নামে এক কাল্পনিক দেবীকে ভক্তি করে ও পূজা দেয় সুন্দরবন সংলগ্ন জনগোষ্ঠি প্রতিবছর জানুয়ারী মাসে অনুষ্ঠিত হয় বনবিবির পূজা বনবিবির মন্দিরেই অনুষ্ঠিত হয় এইপূজা বিভিন্ন লোকসাহিত্যের সূত্র ধরে বলা যায়, বনবিবি বেরাহিম নামে এক আরবদেশির কন্যা বেরাহিমের স্ত্রী গুলাল বিবি সতিনের প্ররোচনায় সুন্দরবনে পরিত্যক্ত হন সেখানে তাঁরর্ভে বনবিবি ও শাহ জাঙ্গুলী জন্ম নেন দক্ষিণ রায় যশোরের ব্রাহ্মণনগরের রাজা মুকুট রায়ের অধীন ভাটির দেশের রাজা ছিলেন তাঁর সঙ্গে বনবিবির একাধিক যুদ্ধ হয় দক্ষিণ রায়পরাজিত হয়ে সন্ধি করেন। পরে বনবিবি সুন্দরবেরন একচ্ছত্র ক্ষমতার মালিক হন।

গাজী কালু ও চম্পাবতীর পূঁথির সূত্র ধরে আমরা আধ্যাত্মিক পীর গাজী ও কালুর সুন্দরবনে আসার কথা জানতে পারি আরো জানতে পারি যে, সুন্দরবনের বাঘ গাজীকে পোষ মানতোএবং তার হয়ে বিভিন্ন যুদ্ধ করতো। এই গাজীর হিন্দু স্ত্রী চম্পাবতীই বনবিবি কিনা এটা পরিষ্কার কোথাও উল্লেখ নেই। তবে দূ:খ নামে এক কিশোরের লোকগাঁথা থেকে জানা যায়।দুঃখকেবনবিবি এসে দুঃখেকে বাঘের কবল থেকে উদ্ধার করেন এবং তাকে কুমিরের পিঠে ভাসিয়ে তার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেন আর সেজন্যই লোকে স্থানীয়দের বিশ্বাস মা বনবিবিতাদেরকে বাঘের হাত থেকে বাঁচাবেন এদিকে বনবিবির ভাই শাহ জঙ্গালী বাঘরূপী দক্ষিণ রায় ও গাজী আউলিয়াকে ধরে বনবিবির কাছে নিয়ে যান গাজী দক্ষিণ রায়ের সঙ্গ ছেড়ে বনবিবির পক্ষ নেন। এভাবেই পরবর্তী সময়েবনবিবি সুন্দরবনজীবী মানুষের কাছে দেবীর মর্যাদা পেয়ে পূজিত হতে শুরু করেন।

ভূতেরা আলো জ্বালায় সুন্দরবনে

সুন্দরবন বড় রহস্য শুধু বাঘ আর ডাকুদের নিয়ে নয় এখানে আছে ভূতদের নিয়েও নানা গল্প স্থানীয় জেলে ও মৌয়ালদের মতে সুন্দরবনের জলে জঙ্গলে প্রায়ই রহস্যময় আলো দেখাযায়! সেই আলোই রাতে জেলেদের নিয়ে যায় মৃত্যুমুখে! জেলেরা সেই আলো দেখলেই নাকি মন্ত্রমুগ্ধের মতো অনুসরণ করে এগোতে থাকে সামনের দিকে তারপর তাদের মৃত্যু হয়জলে ডুবে নইলে অন্য কোনও রহস্যজনক কারণে! কারো মৃতদেহ মেলে কারো মেলেনা।

 

লেখা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন।

ছবি: ইন্টারনেট



আরও পড়ুন...

Quick Search