বাংলাদেশে বিশেষায়িত পর্যটনের সম্ভাবনা (Specialized Tourism in Bangladesh)

  • Ratul Islam 465 16/09/2018

বর্তমান বিশ্বে প্রতিযোগিতার যুগে সাগর, পাহাড় আর গতানুগতিক পর্যটন দিয়ে আমরা কতটা পর্যটক আকৃষ্ট করতে পারবো এই নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। তারচেয়ে বরং আমরা এমনকিছু বিষয় নিয়ে কাজ করতে পারি যেগুলো সব দেশের কিংবা সব জাতির নেই। এবং আমাদের সেসব বিষয়গুলো একান্ত আপনার, সমৃদ্ধ ও অনন্য। ইংরেজীতে বলতে হয়
Rich and Unique. সেসব বিষয়কে সামনে এনে আমরা তৈরী করতে পারি এক নতুন পর্যটন আন্দোলন। আসুন জেনে নেয়া যাক কি হতে পারে সেসব:

বিশেষায়িত পর্যটন।

গ্রামীন পর্যটন/ Rural Tourism

বাংলাদেশের এখনো দূর গ্রামগুলোতে সবুজ-শ্যামল ফসলের মাঠ আছে। যেখানে দিগন্তজোড়া সবুজ আছে। আছে গ্রামের কৃষকের জীবন, আছে জেলে, কামার, কুমোর এর মতো প্রাচীন পেশাজীবি শ্রেনি তাদের জীবন হতে পারে গ্রামীণ পর্যটনের বিষয়।

নদী পর্যটন/ River Tourism
ছোটবড় চারশ নদী রয়েছে বাংলাদেশে। এক তৃতীয়াংশ নদী শুকিয়ে রয়েছে। এক চতুর্থাংশ নদী দূষনে দূষিত। কোনো পর্যটক নিশ্চয় সব নদী  দেখতে যাবেননা। পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ দেখে কিছু নদীকে নির্দিষ্ট এলাকায় পর্যটনের উপযোগী করে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা সংযুক্ত করার মাধ্যমে নদীমাতৃক বাংলাদেশে রিভার ট্যুরিজমকে তুলে ধরতে পারি। এতে নৌকাবাইচ, বিনোদবিহার, মাছ ধরা, সাতার, নদীজীবন, পাথর তোলা, এসবকিছুই হতে পারে ভ্রমণপিয়াসীদের জন্য দেখার বিষয়।

লোকজ পর্যটন/ Folk Tourism
আমরা জানি যে, আমাদের লোকসাহিত্য বিশ্বের অন্যতম সেরা। আমাদের আছে লোকগান, লোকবচন, লোকখেলা, লোকমেলা, লোকনৃত্য, লোককথা, বাউলগান আরো কতো কি? এসব সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন ও এসবকে ঘিরে যা কিছু হয় তা হতে পারে অনন্য বা ইউনিক পর্যটন উপাদান। আমাদের লোকসাহিত্য এতটাই রঙীন শুধুমাত্র পহেলাবৈশাখের শোভাযাত্রার রঙ দিয়েও আমরা টানতে পারি সংস্কৃতিপ্রিয় পর্যটকদের।

হালাল পর্যটন/ Halal Tourism
ইসলামী বা মুসলিম দেশগুলো পর্যটক আকর্ষনের জন্য বিশেষ করে মুসলিম ও আরব বিশ্বের পর্যটকদের আকর্ষন করার জন্য এই নতুন ধারণা প্রবর্তন করে। এই ধারণায় মাদক, জুয়া ও ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম বিনোদনমুক্ত পর্যটনকে উৎসাহিত করা হয়েছে। আমরা চাইলে নিরাপত্তা ও অন্যান্য বিষয় নিশ্চিত করে হালাল ট্যুরিজমকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দিতে পারি।

দ্বীপ পর্যটন / Island Tourism
আমাদের দেশে নদী ও সমুদ্র মিলিয়ে প্রায় ৫০টির মতো দ্বীপ রয়েছে। ইতোমধ্যে পর্যটকদের প্রধান আকর্ষন হলো সেন্টমার্টিন দ্বীপ। দেশের সেরা ১০টি পর্যটন স্থানের মধ্যে ২টি হলো দ্বীপ। নিঝুম দ্বীপও এখন পর্যটকদের টানছে। এভাবে আমরা অন্যান্য  দ্বীপকে সঠিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্বীপ পর্যটনের আওতায় নিয়ে আসতে পারি।

সিবিটি/আরটি
কম্যুনিটি বেজড ট্যুরিজম এবং রেসপন্সিবল ট্যুরিজম এই দুটোধারণা প্রাকৃতিক পর্যটনকে নতুনভাবে জনপ্রিয় করে তুলেছে। এর মাধ্যমে কম্যুনিটির সম্পৃক্ততা ও উন্নয়ন সম্ভব। পর্যটকের সাথে স্থানীয় জনগোষ্টির সম্পৃক্ততার মাধ্যমে কম খরচে নিরাপদ ও জীবনঘনিষ্ট পর্যটন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আমাদের দেশে জনসংখ্যার আধিক্য এবং গ্রামীন জীবনাচারণকে উপজীব্য করে এই ধারণাকে জনপ্রিয় করা যায়।

ধর্মীয় পযর্টন/ Religious Tourism
আমাদের দেশ ধর্মীয় পর্যটনের জন্য হতে পারে এক আদর্শ স্থান। ইসলাম ধর্মের যেমন রয়েছে বিভিন্ন মাহফিল, ইজতেমা, মসজিদ ও মাজার রয়েছে। তেমনি হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মাম্বলীদের রয়েছে মঠ ও মন্দির। হাজার বছরের পুরনো এসব স্থাপত্যও টানবে ভ্রমণপিয়াসীদের। এছাড়া সুফিজম, তাজিয়া মিছিল, বাউল সাধন, নানারকম পূজোসহ কিছু ব্যতিক্রমী আয়োজন রয়েছে আমাদের দেশে যেগুলো সর্বত্র প্রচলিত নয়।

ট্রাইবাল ট্যুরিজম/Tribal Tourism

উপজাতি বলি আর আদিবাসি বলি। আমাদের দেশে ছড়িয়ে থাকা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্টির জীবন-জীবিকা, আচার-আচরণ, বিশ্বাস-সংস্কৃতি পর্যটনের এক সমৃদ্ধ উপাদান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশ্বের মানুষদের কাছে আমরা তুলে ধরতে পারি আমাদের ব্যতিক্রমী এসব নৃ-গোষ্ঠিকে।

মেলা পর্যটন / Fair Tourism
শীতের মৌসুম আসলেই গ্রামে গঞ্জে লেগে যায়। মেলার ধুম। এসব মেলার মাধ্যমে উঠে আসে এই দেশের হাজার বছরের সংস্কৃতির আবহ। একজন বাঙালীর জন্য একটা খুব চেনা বিষয় হলেও। পশ্চিমের একজন মানুষের কাছে তা হতে পারে, নতুন, আকর্ষনীয় এবং বিনোদন মাধ্যম। এসব মেলাকে আমরা পর্যটন উপযোগী করে তুলে ধরতে পারি বিশ্বময়। এটা মূলত কালচারাল ট্যুরিজম এর একটা অংশ।

বধ্য পর্যটন/Dark Tourism
মুক্তিযুদ্ধ যেমন একদিকে আমাদের অহংকার। তেমনি মুক্তিযুদ্ধে আমরা হারিয়েছি আমাদের লাখো সন্তানকে। এই কালো অধ্যায় হতে পারে পর্যটনের বিষয়। দেশজুড়ে বিভিন্ন বধ্যভূমি ও স্মৃতিসৌধগুলো হতে পারে এ্র বিষয়। ঢাকার শহীদমিনার, মিরপুরের বধ্যভূমি এবং সাভারের স্মৃতিসৌধ টানছে মানুষকে। প্রয়োজন শুধু এগুলোকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা।

চিকিৎসা পর্যটন/ মেডিক্যাল ট্যুরিজম
শুনতে অবাক লাগলেও বাংলাদেশে মেডিক্যাল ট্যুরিজম এর অপার সম্ভাবনা রয়েছে। ট্যুরিজমের মধ্যে সবচেয়ে লাভজনক হলো মেডিক্যাল ট্যুরিজম। কারণ চিকিৎসার জন্য আসা পর্যটকেরা যে পরিমাণ অর্থব্যয় করে, অন্যকাজে আসা পর্যটকেরা সাধারণত তা করে না। বাংলাদেশের মেডিক্যাল কলেজগুলোতে রয়েছে প্রচুর বিদেশী শিক্ষার্থী এখানে আমরা একধাপ এগিয়ে রয়েছি। অন্যদিকে বিশ্বের প্রায় অর্ধশতাধিক দেশে রফতানী হয় বাংলাদেশের ঔষধ। বাকী থাকলো ডাক্তারদের পেশাদায়িত্ব ও হাসপাতালে সেবার মান। এটা করতে পারলে আমাদের পাশ্ববর্তী ভারতের কয়েকটি রাজ্য, নেপাল ও ভূটান থেকে আসতে পারে রোগীরা। রোহিঙ্গা সমস্যার আগে আমি নিজে অসংখ্য মায়ানমারবাসী রোগীকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে সেবা নিতে দেখেছি। প্রতি নিয়ত পৃথিবী বদলে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে পর্যটন। আর শুধুই লোকেরা প্রকৃতি দেখার জন্য এখন আর ভ্রমণ করছেনা। নানাবিধ কারণে ভ্রমণ করছে। সেসব কারণগুলো চিহ্নিত করে আমাদের দেশে যদি সেসকল উপাত্ত থাকে তাহলে নতুন করে বিষেশায়িত পর্যটনের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশের পর্যটনকে নতুন জাগিয়ে তুলতে পারি।

লেখা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন (Jahangir Alam Shovon)



Quick Search