নৌকা চালনায় কিছু টিপস ও সতর্কতা

  • Ratul Islam 421 06/09/2018

বাংলাদেশ নদীর দেশ এবং নৌকার দেশ। হরেক নামের যেমন নদী, তেমনি বিভিন্ন রঙের নৌকা। এই নৌকায় চড়ে যেমন বউ নাইওর যায়, তেমনি হাটুরে যায় হাঁটে, মহাজন যায় ঘাটে। যেখানে নৌকাই একমাত্র অবলম্বন সেখানে তো সবাই সবকাজে নৌকাতেই যায়। লোকজন ঘুরতে গেলে কিংবা শখের বশেও নৌকায় চড়ে। নৌকা চালনা একটি দক্ষতার কাজ। এটা অনেক জটিল না হলেও কিছুটা কঠিন বটে, যদি অভ্যেস না থাকে। তাই চাইলে কিন্তু আপনি কোনো বোটিং একাডেমীতে জয়েন করে শিখে নিতে পারেন নৌকা চালনা। আর যদি হাতের কাছে কোনো নিরাপদ সুযোগ থাকে তাহলে চেষ্টা দেখতে পারেন একবার। আর সেজন্য আপনার যে বিষয়গুলো জানা ও বোঝা দরকার সেটাই বলছি।

প্রাথমিক কিছু বিষয়:
নৌকা চালনার জন্য আপনার শরীর ও মন দুটোই নৌকার তুলনায় হালকা হওয়া চাই। বিশেষ করে দেশীয় নৌকা চালাতে হলে। শুধুযে, নৌকা আপনার ভার বইবে তেমন নয়, আপনার নিজেকেও নিজের ভারসাম্য রাখা চাই। আর কাপড় ছোপড় যেন খুব টাইট না হয়, বাড়তি রকমের ঢোলা হলেও সমস্যা। নৌকার ধারণ ক্ষমতা ও কতজন নৌকায় উঠবেন সেটাও একবার বিবেচনায় আনবেন। কোনো যান্ত্রিক দূর্বলতা কাঠামোগত ত্রুটি, আবহাওয়া, ইঞ্জিন, পর্যাপ্ত জ্বালানি এসব চেক করে নেবেন।

নৌকা চালনা:
নৌকা চালনা একটি সুক্ষ কৌশল। এর চালককে কৌশলটি আয়ত্ত করতে হয় এবং প্রয়োগ করতে হয়। সঠিকভাবে চালনায় নৌকা চালনা যেমন সঠিক হবে তেমনি বিপদেও সে নিরাপদ থাকতে পারবে।

১. ভারসাম্য:
নৌকা চালানোর সময় ভারসাম্য দেখতে হয়। মানে ওজন যেন দুপাশে সমান থাকে। ওজনের পার্থক্য কোনো সমস্যা তৈরী করতে পারে। এমনকি নৌকা ডুবেও যেতে পারে।
২. সরঞ্জাম:
নৌকায় খাবার পানি ও অন্যান্য সরঞ্জাম রাখার সময় ওজনের কথা ভাবতে হবে। হালকা যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম রাখতে হবে।
৩.সামনের অংশ:
নৌকার পেছনের দিকের তুলনায় সামনের দিক তুলনামুলক একটা হালকা হবে। ওজনের পার্থক্য আবার বেশী যেন না হয়। সামনের হালকা ওজন নৌকার সামনের অংশকে ঢেউয়ের উপর ভর দিয়ে পার হতে সাহায্য করবে।
৪. ঢেউ কাটা

আমরা পানিতে ভেসে থাকার জন্য সাতার কাটি, পাখি আকাশে ভেসে থাকার জন্য বাতাস কেটে কেটে উড়ে যায়। তেমনি মাছেরাও এই একই কাজ করে পানিতে। এজন্য নৌকা যখন সামনে এগিয়ে চলে তখন ঢেউ কেটে পার হতে হয়। নৌকাকে এমনভাবে চালাতে হয় যাতে ঢেউয়ের আঘাতটা আড়াআড়িভাবে না লাগে। কেননা নৌকার ডান বা বাম যেকোনো একপাশ থেকে ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌকা ডুবে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে। যখন নৌকা আর ঢেউ একটি আরেকটিকে কেটে যায়। ঢেউয়ের ঠিক মাঝখানে দিয়ে নৌকা পার হয়ে গেলে। এতে ঢেউয়ের উপর দিয়ে নৌকা পানিকে দুভাগ করে এগিয়ে চলে। তখন সেটা অনেক নিরাপদ হয়। নৌকা চালনার এটা একটা মূল সূত্র।
৫. পাশ কাটা:
অনেক সময় কোনো বড় ঢেউকে পাশ কাটিয়ে যেতে হয়। বিশেষ করে জাহাজ, লঞ্চ বা সী ট্যাক এর ঢেউ আসে সেগুলোকে হয়তো পাশ কাটিয়ে যেতে হয় অথবা ক্রসকার্ট চেষ্টা করতে হয়। সমুদ্রে বা নদীতে অনেক সময় পানির ঘূর্নি থাকে। দুই দিকের স্রোত এসে যেখানে মিলিত হয়ে সেখানে অনেক সমায় পানি ঘুরপাক খায়। এই জায়গাটি পাশ কাটিয়ে যেতে হয়। কারণ এই ঘূর্নির শক্তি বেশী নৌকা ডুবেও যেতে পারে। যদি মনে হয়, কোথাও চর থাকতে পারে, পানি ঘোলা, কিংবা সেখানে ঢেউয়ের ফ্যানা উঠে। সে জায়গাটিও পাশ কাটাতে হয়। কারণ তাতে নৌকা আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। খুব বেশী স্রোত, বাতাস এসবকেও পাশ কাটানো দরকার।
৬. চরা ও নৌসীমা
অনেক সময় নদীতে এমনিক সমুদ্রে চরা বা চর পড়তে পারে। কখনো সেটা ঢেউ থেকে বোঝা যায়। কখনো বোঝা যায়না। সেজন্য সতর্ক থেকে নৌকা চালনা করতে হয়। কারণ মাটির স্তুপে বড় নৌকা আটকে গেলে সেটা সরানো কঠিন হয়ে যায়। বিশেষ করে ভাটার সময় এমনটা হতে পারে। সীমান্ত এলাকায় নৌকা চালালে নিজ দেশের নৌসীমা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হয়।
৭. ইঞ্জিন নৌকা:
যদি ইঞ্জিন নৌকা হয়। শক্ত করে বসে ভারসাম্য রক্ষা করে চালাতে হয় ডানে বামে এবং সামনে পেছনে। নৌকা চালনা শুরু করার সময় ও শেষে ইঞ্জিন একটা ধাক্কা দেবে সেটার জন্য শক্ত করে বসতে হয়। সামনের দিক থেকে বাতাস থাকলে সতর্ক থাকতে হয় কেননা তাতে নৌকার নিচে বাতাস ঢুকে নৌকা উল্টে যেতে পারে। নৌকার গতি ও পাশ দিয়ে চলাচলকৃত জাহাজের গতির দিকে খেয়াল রাখতে হয়। কারণ কাছাকাছি আসার পর গতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়না ফলে সংঘর্ষ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
৮. বৈঠা
বৈঠার নৌকা হলে শক্ত ও চওড়া বৈঠা দরকার হবে। বৈঠা যেহেতু হাতে চালাতে হয়। আগে পরে হাতের ব্যায়াম করে নিতে হয়। পানিকে ধাক্কা দিয়ে বৈঠা বেয়ে আপনাকে সামনে চলে যেতে হয়। দুইপাশে দুইজন বৈঠা বেয়ে থাকেন তাহলে দুজনকে সমানতালে বৈঠা চালাতে হবে। যদি নৌকা বাম দিকে ঘোরাতে চান তাহলে ডান দিকের বৈঠা জোরো বা লম্বা করে বাইতে হবে। আর যদি ডান দিকে ঘোরাতে হয় তাহলে উল্টো ব্যাপার ঘটবে। এসময় বাইরের দিকে বেশী জোঁক দেয়া যাবেনা মানে শরীর ভার নৌকার বাইরে যেন না যায়। তাহলে দূর্ঘটনা ঘটতে পারে। কারণ বৈঠার নৌকা আকারে বেশী বড় হয়না। যদি পালতোলা নৌকা হয়, তাহলে বাতাসটা ফ্যাক্টর। গুরুত্বপূর্ণ। এটা অন্তত নিজেরা না করে অবশ্যই
একজন পেশাদার মাঝি নিয়োগ দিতে পারেন। যদি নৌকা লগি দিয়ে বইতে হয়। তাহলে কমপক্ষে দুইটা লগি রাখতে হবে। আমার যে সূত্রের বলে পা দিয়ে মাটিকে ধাক্কা দিই বলে শরীরটা নিয়ে হেঁটে চলে। আর লগিগুলো যেন সঠিকভাবে হাতে বা বাঁধায় থাকে। সাধারণত খালে বিলে লগি দিয়ে নৌকা চালানো হয়। এসব ক্ষেত্রে দূর্ঘটনার আশংকা কম থাকে। তবে লগি হারানোর আশংকা থাকে। ঠিক তেমনি লগি দিয়ে যখন মাঝি কোনো একদিকে ধাক্কা দেয় তাহলে নৌকা বিপরীত দিকে গড়াতে থাকবে।

৯. গুনটানা
গুনটানা নৌকার ক্ষেত্রে তৃতীয় ব্যক্তি থাকা ভালো। যে গুনটেনে নৌকাটা নিয়ে যাবে। যদি নদীর কূল ঘেষে নৌকা চালানো হয় তখনি কেবল গুনটানা যেতে পারে। তবে যান্ত্রিক নৌকাতেও গুনটানার জন্য রশি রাখা ভালো। কারণ যান্ত্রিক ত্রুটি কিংবা জ্বালানির সমস্যা দেখা দিলে তখন গুনটানা যেতে পারবে। থাকতে বৈঠাও, সেটা হয়তো বিপদের বন্ধু হতে পারে।

নিরাপত্তার বিষয়সমূহ

১. আবহাওয়া, নৌকার মজবুতি, পথের খবর নিরাপত্তা, যন্ত্র, জ্বালানি, খাদ্য-পানি. পোষাক, অন্যান্য সরঞ্জাম ইত্যাদি দেখে পথে বের হবেন।

২.  অতিরিক্ত জোরে নৌকা চালানো উচিৎ না।  জাহাজ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে হবে। নেভিগেশনাল চিহ্ন অনুসরণ করতে হবে, যেমন বয়া, জালের তুমা ও বাতিঘরের আলো।
২. নৌকায় ভ্রমনের সময়, যাত্রী সংখ্যা, নৌকার রেজিস্ট্রেমন নম্বর, স্কিপারের ফোন নম্বর ইত্যাদি আপনার বন্ধু অথবা পরিবারের সাথে শেয়ার করুন। আপনি অনলাইনে সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেও আপনার পরিকল্পনা শেয়ার করতে পারবেন। এতে তারা আপনার ভ্রমনের ব্যাপারে সজাগ থাকবে।

৪. বাচ্চাদের সাথে নিয়ে নৌকা চালানোতে কিছু অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বাচ্চাদের নৌকা চালানোর ব্যাপরে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় শিক্ষা দিন এবং তাদেরকে বিভিন্ন দায়িত্ব ভাগ করে দিন। সবচেয়ে ভালো হলো আগেই সাতার শিক্ষা দিয়ে রাখলে এবং লাইফ জ্যাকেট পরে থাকলে।
৫. সূর্য় থেকে বাচ্চাদের সুরক্ষা দিতে কিছু নৌকার কিছু অংশে চাউনি রাখুন। তাদেরকে ক্যাপ বা শক্ত করে বাঁধা হ্যাট দিন। বাচ্চাদেরকে জনপ্রতি একটা বাঁশি দিন কোনো বিপদ হলে যেন বাজাতে পারে। কারণ ইঞ্জিনের শব্দের কারণে আপনি বাচ্চার ডাক নাও শুনতে পারেন।

৬. প্রত্যেক যাত্রীকে একটি ভেসে থাকতে একটি ভাসার সরঞ্জাম সাখে রাখা উচিত, যেটি স্থানীয় কোস্ট গার্ড দ্বারা অনুমোদিত।
৭. নৌকার যদি নিজস্ব হর্ন না থাকে তবে পোর্টেবল হর্ন্ও নিতে পারেন।
৮. লাইট আপনার নৌকার নেভিগেশন লাইট চেক করুন। অতিরিক্ত ব্যাটারির সাথে একটি ফ্লাসলাইটও নিয়ে নিন। আপনার দলের বা পরিবারের লোকদের জন্য একটি এলইডি
টর্চ ও সাথে রাখতে পারেন।

৯. প্রয়োজনে সর্তকতামূলক সিগন্যাল যেমন মশাল সাথে নিন। এর ব্যবহার শিখে নিন। এছাড়া বালব ফিল্টার এবং প্লাগও সাথে রাখতে পারেন। এছাড়া ভ্রমনের আগে প্রয়োজনীয় সব ধরনের কাগজ যেমন, নৌকার কাগজপত্র, মাছ ধরার অনুমোদন লাইসেন্স সাথে নিন।

যে বিষয়টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, নৌকার পরিবেশ রক্ষা, নৌকায় কোনো ধরনের প্লাস্টিক ময়লা, যেমন পানির বোতল, চিপসের প্যাকেট এসব ফেলা থেকে বিরত থাকুন।
লেখা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন
ছবি: ইন্টারনেট থেকে