কেন বাদশাহ শাহরিয়ার প্রতিদিন একটি করে বিয়ে করতেন এবং পরের দিনই তাকে জবাই করতেন?

  • Ratul Islam 2535 21/05/2018

অনেক কাল আগে প্রাচ্যের এক বিশাল রাজ্য শাসন করতেন এক বাদশাহ। তার ছিল দুই পুত্র। এক পুত্রের নাম শারিয়ার আরেক পুত্রের নাম শাহজামান। এদের মাঝে শারিয়ার ছিলেন বড়। দুজনের রাজ্য দুই প্রদেশে। দুজনেই শাসক হিসেবে অনন্য। প্রজারা পছন্দ করে তাদের। এভাবে দুই রাজ্যে অনেকগুলো বছর কেটে যায়, দুজনের কারো সাথে কারোর দেখা-সাক্ষাত হয় না। একসময় বাদশাহ শারিয়ারের খুব ইচ্ছে হলো ছোট ভাইকে দেখার। উজিরকে দিয়ে বাদশাহ শাহজামানের কাছে খবর পাঠালেন যেন দ্রুতই চলে আসে তার কাছে। ভাইকে দেখার জন্য মন উতলা হয়ে আছে তার। বড় ভাইয়ের আজ্ঞা পেয়ে সঙ্গে সঙ্গেই যেতে রাজি হয়ে গেলেন শাহজামান। দীর্ঘ রাস্তার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য, সেবক ও নিয়ে যাত্রা করলেন বড় ভাইয়ের রাজ্যের দিকে। নিজের অবর্তমানে রাজ্য পরিচালনার ভার দিলেন নিজের উজিরের উপর। যাত্রাপথে সবকিছুই ঠিকঠাক মতো নিয়েছিলেন, কয়েকদিনের পথ হেঁটেও চলে এসেছিলেন। কিন্তু একসময় মনে হলো বড় ভাইয়ের জন্য যে বিশেষ উপহারটা দেবেন বলে রেখেছিলেন সেটা ভুলে আনা হয়নি। অগত্যা ফিরে গেলেন রাজ্যে।

Alif layla

একা একা ফিরে আসায় মানুষজন টের পায়নি। কোনোদিকে বিলম্ব না করে সোজা চলে গেলেন ভেতরে। রাজা-রানী যেখানে থাকেন সেখানকার দৃশ্য দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। দেখলেন তার বিবি রাজ্যের এক নিগ্রো গোলামকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছে। দুজনেরই পরনের বসন নেই। মাত্র কিছু সময়ের ব্যবধানে বিবির এমন বিশ্বাঘাতকতা দেখে মাথায় রক্ত চড়ে গেল বাদশাহ শাহজামানের। তলোয়ার দিয়ে তখনই খতম করে দিলেন দুজনকে।

এরপর ভগ্ন হৃদয় নিয়ে পৌঁছালেন বড় ভাইয়ের কাছে। সেখানে গিয়ে এতদিন পর দেখা হবার পরেও কোনো আনন্দ নেই তার মনে। এমন দুঃখের কথা ভাইয়ের কাছে বলতেও ইচ্ছে করছে না। পরের দিনও মনের কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। বড় ভাই বুঝলেন তার ছোট ভাই কোনো কারণে দুঃখ পেয়েছে। মন ভালো করতে কিছু করা দরকার। তাই বললেন দুজনে মিলে শিকারে যাবে কিনা। ছোটভাই বললেন, তুমি যাও আমার যেতে ইচ্ছে করছে না।
অগত্যা একাই দলবল নিয়ে শিকারে বের হলেন শারিয়ার। একা একটি কামরায় থেকে রইলেন শাহজামান। এই কামরা থেকে ভেতরের রাজ বাগান দেখা যায়। উদাস হয়ে জানালা দিয়ে সেদিকেই তাকিয়ে রইছিলেন। হঠাৎ তিনি আবারো এমন দৃশ্য দেখলেন যে নিজের চোখকে বিশ্বাস করাতে পারলেন না।
দেখলেন পেছনের দরজা খুলে সেখান থেকে এলো বিশজন দাসী ও একুশজন দাস। পরে এলেন স্বয়ং বড় ভাই শাহরিয়ারের স্ত্রী। এখন একুশজন পুরুষের বিপরীতে মোট নারী হলো একুশ জন। হঠাত করে বেগম ডাকতে শুরু করলেন মাসুদ, ও মাসুদ। ডাক শুনেই চলে এলো এক নিগ্রো গোলাম। দুই হাতে ধরে কোলে তুলে নিলো তাকে। তারপর খোলা মাঠে রতিক্রিয়ার বুনো উল্লাসে মেতে উঠলো তারা। তারপর অন্যান্য দাসরাও বাকি দাসীদের এভাবে কোলে নিয়ে নৃত্যের তালে তালে একইরকম আমোদ ফুর্তি করতে লাগলো। হায় হায়, ভাইয়ের কপাল দেখি তার চেয়েও মন্দ।

শিকার থেকে ভাই ফিরে এলেন, মনে কষ্ট পেতে পারে বলে বলতে চাইলেন না ঘটনার কথা। নিজে একাই যে হতভাগা ও প্রতারিত না এটা ভেবে কিছুটা হালকাও অনুভব করলেন। পরের দিন সকালে ছোট ভাইয়ের মানসিক উন্নতি দেখে বড় ভাই জানতে চাইলেন কী হয়েছিল তার? কেন ছিল মনমরা? তখন নিজের বেগমের বিশ্বাসঘাতকতার কথা খুলে বললেন। ঘটনা শুনে বড় ভাই খুবই দুঃখ পেলেন। এর পরেই আবার প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, এখন কেন তাহলে মনের উন্নতি হয়েছে? এমন প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না শাহজামান, স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। বড় ভাইকে তার বেগমের কথা বলা উচিত হবে না, বললে ভাইটি তার খুব কষ্ট পাবে। শারিয়ারের চাপে বলতে বাধ্য হলেন। “হায় আল্লাহ তোমাকে এত করে বলছি তবু কেন বলতে চাইছো না? সঙ্কোচ করে কোনো লাভ নেই, তুমি বলো, দেখি।” ঘটনা শুনে নিজের কানকে বিশ্বাস করাতে পারছিলেন না শারিয়ার। বললেন আমি নিজের চোখে দেখতে চাই। তখন শাহজামান পরামর্শ দিলেন, শিকারের নাম করে কয়েক দিনের জন্য রাজ্যের বাইরে যেতে। সকলে জানবে রাজা রাজ্যের বাইরে আছে, কিন্তু রাতের বেলা চুপি চুপি চলে আসবে রাজপ্রাসাদের ভেতর। তাহলে নিজের চোখেই দেখতে পাবে বেগমের কাণ্ড।

শিকারের ঘোষণা দিলেন শারিয়ার, কয়েকজন কর্মীকে সাথে নিয়ে চললেন এগিয়ে। রাতের বেলা কর্মীদেরকে রেখে ফকিরের বেশে ফিরে এলেন রাজ্যে। অন্দরমহলে গিয়ে দেখেন নিজের বেগম সেখানে নেই। বেগমকে না দেখে গেলেন শাহজামানের ঘরে। সেখান থেকে তাকিয়ে রইলেন জানালা দিয়ে। রাত বাড়তেই আগে মতো করে চলে এলো বিশ জন দাসী এবং একুশ জন দাস। রানী সহ মোট নারী একুশ জন। রাতভর সকলে মিলে নাচ গান ও নান রকম অশ্লীলতায় মত্ত হয়ে রইলো। এ দৃশ্য দেখে অত্যন্ত মনঃক্ষুণ্ণ হলেন শারিয়ার। মনের দুঃখে বললেন চল ভাই, এই পাপের রাজ্য ছেড়ে চলে যাই। এমন কোনো স্থান খুঁজি যেখানে এমন বিশ্বাসঘাতকতা নেই। ঐ রাতেই নিরুদ্দেশের উদ্দেশ্যে পথ হাঁটা ধরলেন দুই ভাই। দিন রাত হেঁটে একসময় চলে এলেন এক সাগরের তীরে। আশেপাশে মানুষজন কিংবা বাড়িঘর নেই। অদূরে একটা বটগাছ আছে শুধু। ক্লান্ত দুই ভাই গিয়ে বসলেন বট গাছের তলায়। এখানে একটু বিশ্রাম নেয়া দরকার। সেখানে বসার কিছুক্ষণ পর তাদের চোখের সামনে ঘটে গেল একটি অলৌকিক ঘটনা। তারা দেখতে পেলেন সাগরের জলরাশির মাঝে থেকে বের হতে লাগলো ধোঁয়ার এক কুণ্ডলী। সেই কুণ্ডলী থেকে ধীরে ধীরে রূপ নিতে থাকলো এক অতিকায় দৈত্য। সে-ও এগিয়ে আসছে বটগাছটির দিকে। বিপদ অনুমান দ্রুত গাছের তলা থেকে গাছের ডালে গিয়ে আশ্রয় নিলেন দুই ভাই। উপরে আশ্রয় নিলেন যেন দৈত্য তাদেরকে দেখতে না পায়। দৈত্যটা কাছে আসতেই দেখতে পেলো তার মাথায় একটি বড় একটি চৌকোনা বাক্স। গাছের তলায় এসে বাক্সটি মাথা থেকে নামালো এবং সেটি খুলে সেখান থেকে একটি সিন্দুক বের করলো। সিন্দুকটি খুলতেই বেরিয়ে এলো পরীর মতো পরমা সুন্দরী এক নারী। তাদের কথোপকথন থেকে দুই ভাই বুঝতে পারলো দৈত্যটি তাকে মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে অনেকদিন ধরে। এমন একটি জায়গা খুঁজছে যেখানে মেয়েটি প্রতারণা করার সুযোগ পাবে না। মরুভূমি থেকে পানির তলদেশের পাতালপুরী কোনো স্থান বাদ রাখেনি। খুঁজতে খুঁজতে আজকে এখানে এসে ঠেকেছে। টানা পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে গেছে বলে বট গাছের তলায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ঘুমাবে। দৈত্য ঘুমানোর পর এদিক ওদিক অনুসন্ধান করে বেড়ালো মেয়েটি। হঠাৎ গাছের ডালে দেখতে পেলো দুই ভাইকে। দেখে তাদেরকে ডাকলো। দুই ভাই আসে না। যুবতী বলে ভয় নেই, কিচ্ছুটি হবে না, এখন ঘুমও ভাঙ্গবে না দৈত্যের। তাতেও ভাইদের দ্বিধা কাটে না। যেকোনো মুহূর্তে ঘটে যেতে পারে বিপদ। রেগে গেল মেয়েটি। চোখ রাঙিয়ে বললো এখনই না এলে দৈত্যকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তাদের অবস্থানের কথা বলে দেবে। ভয়ে ভয়ে দুই ভাই নেমে এলে দুজনকে একসাথে কু-প্রস্তাব দিয়ে বসে মেয়েটি। দুই ভাই দ্বিধা করলে বলে এখনই দৈত্যকে জাগিয়ে তাদেরকে ধরিয়ে দেবে। অগত্যা জীবন রাক্ষার জন্য তাদেরকে মেয়েটির কথা শুনতেই হলো। তারপর জামার পকেট থেকে একটি থলে বের করে আনলো। থলেটিতে আছে অনেকগুলো আংটি। আংটিগুলো তাদের দেখিয়ে বললো, এগুলো আমার স্মৃতি চিহ্ন, যতজন পুরুষের সাথে আমি অবকাশ যাপন করেছি তাদের কাছ থেকে একটি করে আংটি সংগ্রহ করেছি স্মৃতি হিসেবে। এখানে একশো সত্তুরটি আংটি আছে। তোমরাও আমাকে একটি করে আংটি দাও। পরবর্তীতে যখনই এগুলো দেখবো তোমাদের সাথে কাটানো এই মুহূর্তের কথা মনে হবে। এই দৈত্যটা আমাকে বিয়ের আসর থেকে তুলে নিয়ে এসেছে। শিকলে বেঁধে সিন্দুকে ভরে রাখে আমাকে। মরু প্রান্তরে, জঙ্গলে, পাহাড়-পর্বতে সবখানে নিয়ে গেছে লুকিয়ে রাখার জন্য। কিন্তু কোথাও পছন্দমতো স্থান না পেয়ে শেষমেশ নিয়ে গেছে পানির তলদেশে। কোনোভাবেই যেন পুরুষের সান্নিধ্য না পাই আমি সেজন্য এই ব্যবস্থা। কিন্তু বোকা দৈত্যটা তো জানে না, আমরা মেয়েরা চাইলে সবই করতে পারি। এই একশো সত্তুরটা আংটি তারই প্রমাণ। মেয়ের এমন কাণ্ড দেখে খুবই ক্রোধান্বিত হলেন শারিয়ার। সমগ্র নারীজাতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে গেলেন। দ্রুত রাজ্যে ফিরে নিজের হাতে বিবির গর্দান কেটে নিলেন। রাজ্যের যত দাসী আছে তাদেরও গর্দান কেটে নেবার হুকুম দিলেন। উজিরকে হুকুম দিলেন প্রতিদিন তার একটি করে কুমারী যুবতী নারী চাই। একদিনের জন্য তাদের বিয়ে করা হবে এবং সারারাত ভরে প্রতিশোধ নেবার মতো করে পৈশাচিকভাবে ভোগ করা হবে তাদের। সকাল বেলায় সেসব যুবতীদের নিজের হাতে জবাই করে হত্যা করা হবে, যেন কোনোদিন বিশ্বাসঘাতকতা করার কোনো সুযোগই তারা না পায়।

উজিরও জীবনের ভয়ে প্রতি রাতে একটি করে কুমারী যুবতী আনতে থাকে এবং শারিয়ারও প্রতিদিন একজন করে স্ত্রী জবাই করতে থাকে। এভাবেই চলতে থাকে শারিয়ারের নারীবিদ্বেষী জীবন। কিন্তু যুবতী নারী তো আর অফুরন্ত নয়। একসময় না একসময় তো রাজ্যের সকল যুবতী নারী শেষ হয়ে যাবে। হলোও তা। যারা পেরেছে আতঙ্কে রাজ্য ছেড়ে পরিবার নিয়ে পালিয়েছে। যারা থেকেছে তারা বাদশাহের আক্রোশের শিকার হয়ে জীবন বিসর্জন দিয়েছে। একসময় সারা রাজ্য ঘুরেও কোনো কুমারী যুবতী পেলেন না উজির। খালি হাতে রাজার কাছে গেলে নিজের জীবন খোয়াতে হবে ভেবে আর গেলেন না, বাড়িতে চলে গেলেন।

ঘটনাক্রমে তার আছে দুই মেয়ে। দুজনই রূপবতী এবং বুদ্ধিমতী। বড় মেয়ের নাম শাহরাজাদ (শেহেরজাদ) এবং ছোট মেয়েটির নাম দুনিয়াজাদ। শাহরাজাদ ইতিহাসে পারদর্শী, দুনিয়ার সকল রাজ রাজার কাহিনী, বৈচিত্র্যময় উপকথা ও কিংবদন্তী তার জানা। বাবার বিপদের কথা শুনে বড় মেয়ে নিজেই রাজার স্ত্রী হতে চাইলেন। বাবা এতে অসম্মত হলে নানাভাবে বুঝিয়ে তাকে রাজি করিয়ে ফেললেন তিনি। তার বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার কারণেই স্ত্রী হত্যা থেকে বিরত থাকে শারিয়ার। তার বুদ্ধিমত্তাকে কেন্দ্র করেই বিকাশ লাভ করেছে আরব্য রজনীর গল্প। তার মুখে বলা গল্প দিয়েই অতিবাহিত হয়েছে সহস্র এক আরব্য রজনী।