কৃষকের বাড়ীতে নবান্নের দাওয়াত

  • Jahangir Alam Shovon 307 29/11/2017

নবান্নের উৎসবে

কতো দেশ বিদেশ ঘুরেছেন। দেখেছেন পাহাড় নদী অরণ্য আর শহরের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা সুন্দরের জয়গান। অগ্রাহায়ন কার্তিক মাসে কখনো গিয়েছেন সোনাধানের ক্ষেতে? দেখেছেন কৃষকের সুখ, কৃষানীর হাসি আর ধানের গাদায় দুস্টুমি করে বেড়ানো তাদের শিশুদের আনন্দ। অনেকেই দেখেছেন। ছোটবেলায়। হয়তো এখন মনে পড়ছে ধানক্ষেতে লুকিয়ে লুকালুকি কিংবা কানামাছি খেলার কথা। পাকা ধানের মৌ মৌ গন্ধটাকি নাকে বাঝে এখন।

 

শেষ কবে কৃষকের সাথে ধানক্ষেতে নেমেছেন? শেষ কবে ধরে দেখেছেন পাকাধানের মতো মুঠি মুঠি সোনা। চাইলে আপনি এই নবান্নে একটি ভ্রমণ পরিকল্পনা করে শহর থেকে খুব কাছে কোনো গ্রামে যেতে পারেন। কৃষকের সাথে ভাগাভাগি করে নিতে পারেন ধানকাটা আর ধান মাড়ায়ের আনন্দ। ক্ষেতের আলে বসে পোড়ামরিচ দিয়ে পান্তাভাত খাবার স্মৃতিটাও ফিরেয়ে আনতে পারেন। শোল মাছের জেলির মতো ঝোল দিয়ে খেতে পারেন লারকির চুলায় রান্না করা মোটা চালের ভাত। আরো কত কি?

 

 নবান্নের আগে বাংলার ফসলে মাঠে সোনা রঙের সোনালি ধান পাকে। ধানে ধানে ভরে যায় কৃষকের আঙিনা। একটুকরো অবসর নেই বৌ ঝিয়েদের। ধান নিয়ে সারাদিন কাজ করা। নাওয়া খাওয়ার ঠিক নেই। ধান নিতে হবে। কাজ শেষ করতে হবে। তারপর শুকিয়ে গোলায় তুলতে হবে। অনেক কাজ কৃষাণ কৃষাণীর কিংবা তাদের ছেলে মেয়েদের। তাতে কি নতুন ফসলের মিষ্টি হাসি ছড়িয়ে থাকে কৃষানীর মুখে। চাষির মনে বয়ে যায় অনাবিল আনন্দধারা।

 

সভ্যতার ইতিহাসে কৃষিতে বিপ্লব সাধিত হয় মানে সার্বজনীনভাবে চাষবাস শুরু হয় এবং মানুষ বন থেকে বেরিয়ে নদীর পাড়ে বসতি গড়তে শুরু করে সেটা হলো খ্রিষ্টপূর্ব ৮০০০-খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০০ অব্দের কথা। আজ থেকে প্রায় ৭ থেকে ১০ হাজার বছর আগের কথা। ধারণা করা হয় এই সময়টাতেই নবান্ন উৎসব দেশে দেশে তার নিজরুপে প্রচলন শুরু হয়।

৫৫০০ খ্রিষ্টপূর্বব্দের মধ্যেই মিশরীয়রা ছোট ছোট গোত্রভিত্তিক সমাজ পশুপালন এবং কৃষিকাজে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এর মূল কেন্দ্র ছিলো নীল নদ। মিশরিয়রা তিনটি ঋতু চিহ্নিত করেছিল, আখেত বা বন্যাঋতু, পেরেত বা রোপনঋতু এবং শেমু বা ফসল কাটার ঋতু। মার্চ হতে মে মাস পর্যন্ত ফসল কাটা হত এবং মাড়াই করে শস্যদানা আলাদা করা হত। সে এক উৎসবের আমেজ ছিলো। তবে এই উৎসব সবার জন্য ছিলো না। তা কেবল সামন্ত শ্রেণী, জমিদার জোতদারদের জন্য ছিলো। আর যারা ক্ষেতে কাজ করতো, সে জলপাই আঙুর কিংবা আপেল বাগানই হোক না কেন? যেসসব ক্রীতদাসদের জীবনে সে উৎসবের কোনো ছায়া পড়তনা।

 

ইউরোপে ১লা সেপ্টেম্বর থেকে বৈচিত্র্যময় রঙ ও পাতা ঝরার ঋতু।  ইন্দোনেশিয়ায়ও নতুন ফসল তোলার সময় গ্রামবাসী নানা রঙের পতাকা বানায়, বাঁশ দিয়ে মন্দির তৈরি করে। এ সময় তারা চাল দিয়ে ছোট ছোট পুতুল তৈরি করে। ফলের দেশ থাইল্যান্ডের নবান্ন মানে ফল উৎসব । কখনো ফল দিয়ে বানানো ড্রাগন, কখনো জাহাজ আরো কতোকি? ইতালির ম্যাজিওনি শহরে নভেম্বরে মেতে ওঠে জলপাই উৎসবে।  স্পেনে টমোটোর মৌসুমে লোকেরা মেতে উঠে টমেটো উৎসবে। ঘরবাড়ী রাস্তাঘাট লাল টমোটোর টসটসে রসে ভরে যায়। আর দেশ-বিদেশ থেকে লোকেরা এসে টমোটো মারামারি খেলে। মানে একজন আরেকজনের দিকে গলিত টমেটা ছুড়ে মারে।

যুক্তরাজ্যের পূর্ব সাসেক্সের গ্রামেও পালিত হয় নতুন ফসল তোলার আনন্দ উৎসব। তাতে কৃষকরা নিজেদের সাজিয়ে তোলে বিচিত্র সব সাজে। গ্রামের পথে পথে বসে ঐতিহ্যবাহী নাচ-গানের আসর। চীন ও ভিয়েতনামে দুটি দেশই একযোগে পালন করে নবান্নের মুন বা মুনকেক ফেস্টিভ্যালও বলে। তারাও আমাদের মতো নানারকম পিঠা বানায়।

 

বাংলাদেশের কয়েকটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠিও নবান্ন উৎসব পালন করে। সাঁওতালরা পৌষ-মাঘ মাসে শীতকালীন প্রধান ফসল ঘরে তুলে উদ্যাপন করে সোহরায় উৎসব। উসুই উপজাতি  অন্নের দেবীকে অভ্যর্থনা জানিয়ে মাইলুকমা উৎসব পালন করে। জুম চাষি ম্রো উপজাতি চামোইনাত উৎসবে মুরগি বলি দিয়ে নতুন ধানের ভাতে সবাইকে ভোজন করায়।

বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের কিছু কিছু এলাকায় নবান্ন উৎসব অত্যান্ত উৎসব মুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশের বগুড়া জেলার আদমদিঘি উপজেলার শালগ্রাম সহ আশেপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামে আবহমানকাল ধরে নবান্ন উৎসব অত্যান্ত উৎসব মুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়ে আসছে। 

 

দিনাজপুরের এখনো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির নারী পুরুষ ঢোল বাজনা নিয়ে গান গাইতে গাইতে প্রথমদিন ধান কাটে। ‘‘আটোল পাতে গিলেই হামার লাতি
টেংরা মাছের ঝোল লেলায় রাতি।’’ এরকম বাংলাদেশের আনাচে কানাচে এখন নবান্ন সংস্কৃতি বেঁচে আছে। আমরা কদাচিত তার খবর রাখি। বাংলার সংস্কৃতি জীবনেরই অংশ যেন। এটা কোনো নিছক আনুষ্টানিকতা নয়। তাই এখানে আচার এর চেয়ে বিশ্বাসটা বড়। সেজন্য এতে আড়ং আছে কিন্তু বাগাড়ম্বর নেই, এতে রং আছে কিন্তু সেখানে কৃত্রিমতা নেই। আপন মহিমায় উজ্জল নবান্নের গানগুলোও বাংলা লোকসাহিত্যের মূল্যবান সম্পদ। তাই হারিয়ে যাওয়ার আগে এগুলোকে বাঁচাতে হবে সযতনে।

 

 পরে ধীরে ধীরে গ্রামে গঞ্জে আস্তে আস্তে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ গ্রামীন জীবনে নিজেদের মতো করে আবার অন্যান্য পার্বনের মতো নবান্নকেও তাদের যাপিত জীবনের অংশ করে নেয়। কিন্তু নাগরিক সভ্যতার নানা উপাদান যেন নবান্নের সে সূরকে বেসুরে করে তুলছিলো দিনে দিনে। আর নগর ব্যাপ্তির প্রভাবে একশ্রেণীর শহুরে মানুষে যেমনি সেই নতুন ধানের মৌ মৌ ঘ্রাণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলো তেমনি দূরে সরে যাচ্ছিল নবান্নের আমেজ থেকে।

 

আবহমান বাংলায় কৃতজ্ঞতা বা শুকরিয়া প্রকাশের জন্য শুধুযে শিন্নী মানত হতো কিংবা আত্মীয় স্বজনকে নিমন্ত্রন করে খাওয়ার আয়োজন হয় তা নয়। বরং নবান্ন উপলক্ষ্যে মেয়েকেও বাপের বাড়িতে নাইওর আনা হয়। জামাই বেড়াতে যায় শ্বশুরবাড়িতে। পিঠা আর পুলি পাঠানো হয় বেয়াইবাড়িতে আরো কতো আয়োজন। নবান্ন উৎসবে গ্রামগঞ্জে কোথাও আয়োজন করা হয় গ্রামীণ মেলার। আমাদের দেশে একসময়ের বর্ষাকালের পটগান এখন নবান্ন উৎসেব পরিবেশন করা হয়। উত্তরবাংলার গম্ভীরার পরিবেশনাও মনোমুগ্ধকর, সহজ কথায় বলি নানা নাতির গান। ধানতোলা শেষ হলে শীতের আমেজে পালাগান। মহুয়ার পালা,  গ্রামীন ঐহিত্যবাহী লাঠিখেলা, এসবের সাথে সাথে নাগরিক নবান্ন উৎসবে থাকে ধামাইল গানসহ লোকজ নানা আয়োজন।  আজকাল গ্রামীণ পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে নবান্ন উৎসব। দেশী বিদেশী মেহমানরা গ্রামের কোনো কৃষকের বাড়ীতে যায়। সেখানে গিয়ে ভাত-মাছ-ডাল কিংবা শিন্নী পায়েস খায় যেটা নতুন ধানে রান্না হয়।

আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে—এই বাংলায়/হয়তো মানুষ নয়—হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে/হয়তো ভোরের কাক হয়ে কার্তিকের নবান্নের দেশে।

 

-জাহাঙ্গীর আলম শোভন

 

 

 



আরও পড়ুন...