সিলেটের দর্শনীয় স্থান

  • Jahangir Alam Shovon 4006 24/11/2017

সিলেটের নির্বাচিত ১০টি দর্শনীয় স্থান

 

বাংলাদেশের মোট ১৬৩টি চা বাগানের  ১৩৫টি বৃহত্তর সিলেটে।  ইংরেজ সাহেব হার্ডসনের হাত ধরে ১৮৪৯ সালে ১৫০০ একর জায়গা জুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয় উপমহাদেশের প্রথম চা বাগান মালনীছড়া।  তবে ঝামেলা এড়াতে বাগানে প্রবেশের আগে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেয়াই ভালো। সিলেট শহর থেকে সহজে মাঝারগুলোতে যাওয়া যায়। শুধু আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোন মাঝারে যাবেন এবং কখন কোন দিক দিয়ে প্রবেশ করবেন। আসুন চা বাগান ছাড়াও সিলেটের অন্যান্য যেসব নির্বাচিত স্থান আছে সেগুলোর নিয়ে আলোচনা করা যাক।

১। মাঝারের সিলেট

২। বিছানাকান্দিঃ-

৩.মাধবকুন্ড (জলপ্রপাত) ঃ-  

৪। জাফলং:

৫.লালাল
৬. শ্রীমঙ্গল
৭.হাম হাম
৮.লাউয়াছেড়া রেইন ফরেস্ট
১০. হাকালুকিঃ
১০. টাঙ্গু-ইয়া হাওড়

 

মাজার:

মাজার বলতে প্রথমেই আসে হযরত শাহ জালাল (র) মাজার। শাহজালাল ও তাঁর সফরসঙ্গী ৩৬০ জন আউলিয়ারসিলেট আগমন ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তাঁর পুরো নাম শায়খ শাহ জালালকুনিয়াত মুজাররদ। ৭০৩ হিজরী মোতাবেক ১৩০৩ ইংরেজী সালে ৩২ বত্সর বয়সে ইসলাম ধর্ম প্রচারের লক্ষ্যে অধুনা বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে এসেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। তাঁর পিতা ছিলেন একজন ধর্মানুরাগী মোজাহিদ, ইয়্যামনে ধর্ম যুদ্ধে তিনি নিহত হন তখন। সিলেট বিজয়ের পর দিল্লীর সুলতান শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহ, শাহ জালালকে সিলেটের শাসনভার গ্রহণের প্রস্তাব করেন। কিন্তু শাহ জালাল এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। পরবর্তিতে সুলতান বিশেষ ঘোষণা জারি করে সিলেট শহরের (কসবে সিলেট) খাজানা মুক্ত করে দরবেশকে সম্মানীত করেন যা এখনো (দরগাহর সংশ্লিষ্ট এলাকা) বলবত আছে। সারাবছর অসংখ্য ভক্ত শাহ জালালের মাঝার জিয়ারত করতে যান। এছাড়া আছে শাহ জালালের বাগিনা শাহপরানের মাজার।

শাহজালালের মাজারে কিভাবে যাবেন, কাউকে বলে দিতে হয়না। কারণ এই দরগা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত।

বিছানাকান্দি

পাথর, পানি, পাহাড় আর আকাশ নিয়েই যেন বিছানাকান্দি। এখানে আসার পর যে কথাটি সর্বপ্রথম মনে হয় তা হল প্রশান্তি। এই প্রশান্তিটুকু নিমিষেই ভুলিয়ে দেয় প্রতিদিনকার শত গ্লানি। প্রকৃতির সৌন্দর্যের কাছে যেন হার মানতেই হয় নাগরীক সভ্যতাকে। আর এই চরম সত্যটুকু উপলব্ধি করতে হলে আপনাকে চলে আসতে হবে বিছানাকান্দিতে। শুধু পা ভিজিয়ে ক্ষান্ত থাকেন না এখানে আসা মানুষগুলো। শরীর এলিয়ে দিয়ে যখন চোখ বুজে আসে তখন একে পাথরে ভরা বাথটাব বলেই মনে হয়। বর্ষার সময়টাতে পানিতে টইটুম্বুর থাকে বিছানাকান্দি আর তখন একে তুলনা করা যায় সবে কৈশোর ছেড়ে যৌবনে পা দেওয়া তরুনীর সাথে। অপরূপ চোখ জুড়ানো এক মোহনীয়তায় যেন আবিষ্ট করে রাখে এখানে আসা মানুষগুলোকে। 

মাধবকুন্ড

জলপ্রপাতের অবিরাম স্রোতধারা প্রবাহিত হওয়ায় পাহাড়ের শরীর পুরোটাই যেন কঠিন পাথরে পরিনত হয়েছে। জলরাশি নির্গত কুণ্ডের ডানদিকে রয়েছে বিশাল গুহা। আদিম যুগের মানুষ গুহায় বসবাস করলেও আধুনিক যুগের মানুষ গুহার সাথে তেমন পরিচিত নয়। তবে মাধবকুণ্ডে এলে গুহার ভেতর প্রবেশ করে নতুন আমেজ পাওয়া যায়। পাহাড়ের গভীরে তৈরি গুহাকে আধুনিক কারুকচিত পাথরের একচালা মনে হয়ে থাকে। গুহাটির সৃষ্টি প্রাকৃতিক ভাবে হয়েছে বলে অনেকে ধারণা

খাদিমনগর ফরেস্ট

শহরতলীর শাহপরাণ মাজার গেট থেকে তামাবিল রোডে সামান্য গেলেই হাতের বাম পাশ দিয়ে ভেতরে গেছে খাদিম জাতীয় উদ্যানের রাস্তা। প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার পথ মাড়িয়ে ভেতরে উদ্যান (খাদিম রেইন ফরেস্ট)। কিন্তু চা বাগানের জন্য এতোদূর যাওয়ার প্রয়োজন নেই। তামাবিল রোড থেকে একটু ভেতরে গেলেই একে একে পাওয়া যাবে বড়জান চা বাগান, গুলনি চা বাগান এবং খাদিম চা বাগান।

জাফলং

সিলেটের আরেক দর্শনীয় স্থানের নাম জাফলং। ভারতের মেঘালয়ের বিশালাকৃতির দুটি পাহাড়ের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসা পিয়াইন নদীর স্রোতধারা পড়েছে জিরো পয়েন্ট হয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে। কোথাও পায়ের পাতা, কোথাও গোড়ালি আর কোথাও হাঁটু সমান স্বচ্ছ শীতল জলের ধারার নিচে রং বেরঙের গোলাকৃতির পাথর বিছানো। অমন জলে গা ভেজানো কিংবা ডিঙি করে ঘুরে বেড়ানোর সুখানুভূতি অসীম! দুই দেশের সীমানায় কোনো দেয়াল বা কাঁটাতারের বেড়া পর্যন্ত নেই। বিজিবি-বিএসএফ পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করছে। একই জলে ভিন্ন ভাষাভাষী দুই দেশের মানুষ যার যার নির্ধারিত স্থানে প্রকৃতির নান্দনিকতায় অবগাহন করছে।

রাতারগুল

দেশের একমাত্র এবং বিশ্বের অন্যতম জলাবনের নাম রাতারগুল। সিলেট শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত রাতারগুল বন। পর্যটকদের নিকট এটা রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট নামেও পরিচিত। ভরা বর্ষায় স্থানীয় হস্তচালিত ডিঙি নৌকায় চড়ে রাতারগুল জলাবনে ঘুরে বেড়ানোর মধুর স্মৃতি ভুলা যাবে না সহজে।

লালাখাল

স্বচ্চ নীল জল রাশি আর দুধারের অপরুপ সোন্দর্য, দীর্ঘ নৌ পথ ভ্রমনের সাধ যেকোন পর্যটকের কাছে এক দূর্লভ আর্কষণ। তেমনি এক নির্জন মনকাড়া স্থান লালাখাল। বাংলাদেশের সবোর্চ্চ বৃষ্ঠিপাতের স্থান এবং রাতের সৌন্দর্যে ভরপুর এই লালাখাল সিলেট জেলার জৈন্তাপুর উপজেলার সন্নিকটে অবস্থিত। সারি নদীর স্বচ্চ জলরাশির উপর দিয়ে নৌকা অথবা স্পীডবোটে করে আপনি যেতে পারেন লালা খালে। যাবার পথে আপনির দুচোখ সৌন্দর্য দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে যাবেন কিন্ত সৌন্দর্য শেষ হবে না।

 

শ্রীমঙ্গল

 দেশের চা বাগানের প্রায় নব্বই শতাংশ শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত। এই বাগানের শ্রমিকরা প্রায় সকলেই মণিপুরী এবং খাঁসি (খাঁসিয়া) জাতিসত্তার অধিকারী। পর্যটকেরা চাইলেই ঘুরে দেখতে পারেন তাদের পল্লী বা বসতি। পর্যটকেরা চাইলে শ্রীমঙ্গলের চা কারখানাও ঘুরে দেখতে পারেন। টি রিসার্স ইনস্টিটিউট হতে পারে পরিদর্শনের অন্যতম একটি জায়গা। দেখতে পাবেন চা প্রস্তুত প্রণালী। বাগানের ভেতর শ্রমিকদের সঙ্গে খানিকটা সময়ও কাটানো যেতে পারে। শ্রীমঙ্গলে থাকার জায়গা হিসেবে টি রিসার্স ইনস্টিটিউটের ‘টি রিসোর্ট’ অত্যান্ত চমৎকার একটি জায়গা। কোন কালে সৃষ্টি হয়েছে এই লেকের তা কেউ বলতে পারে না। সমতল থেকে উঁচুতে পাহাড়ে লেকটির অবস্থান। এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ খুব সুন্দর। সময় করে লেকের চারপাশ প্রদক্ষিণ করতে পারলে নিঃসন্দেহে তা হবে এক দারুণ অভিজ্ঞতা।

শ্রীমঙ্গল। শহর থেকে ৮ কি.মি দূরে লাউয়াছড়া রেইন ফরেস্ট এর অবস্থান। শ্রীমঙ্গল যাবার সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে ট্রেন। সকাল সাতটায় পারাবত এক্সপ্রেস আর রাতে উপবন এক্সপ্রেস সিলেটের উদ্দেশে কমলাপুর থেকে ছেড়ে যায়। সকালের ট্রেনটিই অপেক্ষাকৃত ভাল। ট্রেনে যাওয়ার আরেকটি বারতি সুবিধা হল ট্রেনটি লাউয়াছড়া ফরেস্ট এবং হবিগঞ্জ গ্যাস ফিল্ডের মধ্য দিয়ে যায়। আর বাসে যেতে চাইলে শ্রীমঙ্গলের জন্যে এনা, শ্যামলী আর হানিফই ভালো। দিনের বেলায় যদি আসেন তবে শ্রীমঙ্গলে ঢোকার অনেক আগে থেকেই দেখবেন রাস্তার দু’ধারে সারি সারি চা বাগান। চারদিকে সবুজের সমারোহ। চোখ ফিরালেই শধু সবুজ। শ্রীমঙ্গলে পোঁছে কোন গেষ্ট হাউজে উঠে ফ্রেশ হয়ে আশে পাশের চা বাগানগুলো ঘুর দেখতে পারেন। পরদিন সকালে খূব ভোরে চলে যান লাউয়াছড়া। চাইলে খুব সকালে ঢাকা থেকে রওনা হয়ে সরাসরি লাউয়াছড়া যেতে পারেন। কিন্তু খুব ভোরে বনে ঢুকতে না পারলে আপনি বিলুপ্ত প্রায় উল্লুকের দেখা পাবেন না।

হাম হাম ঝর্ণা

হাম হাম

হামহাম যাওয়ার জন্য বনের ভেতর দুটি পথ আছে। বনের শুরুতেই হাতের ডানে ও বামে পাশাপাশি পথ দুটির অবস্থান। একটা দিয়ে যেতে হবে আরেকটা দিয়ে আসবেন। ডানের পথ দিয়ে ঢুকে বাম দিয়ে বের হবেন এটাই ভালো, কারন ডানের পথটা দীর্ঘ এবং অনেক গুলো উঁচু টিলা ডিংগাতে হয়, যা ফেরার পথে পরলে খুব কষ্ট হবে, তাই প্রথমে কষ্ট হলেও আসার সময় একটু আরাম করে আসবেন, ফেরার পথ কম না তবে সমতল বেশি, টিলা কম পেরোতে হয়। হামহাম যাবার জন্য সাথে একজন গাইড নিয়ে যাওয়া অত্যাবশ্যক। 

আয়নার মতো স্বচ্ছ পানি পাহাড়ের শরীর বেঁয়ে আছড়ে পড়ছে বড় বড় পাথরের গায়ে। গুড়ি গুড়ি জলকনা আকাশের দিকে উড়ে গিয়ে তৈরি করছে কুয়াশার আভা। বুনোপাহাড়ের ১৫০ ফুট উপর হতে গড়িয়ে পড়া স্রোতধারা কলকল শব্দ করে এগিয়ে যাচ্ছে পাথরের পর পাথর কেটে সামনের দিকে তার গন্তব্যে। চারিপাশ গাছ গাছালি আর নাম না জানা হাজারো প্রজাতির লতাগুল্মে আচ্ছাদিত হয়ে আছে পাহাড়ি শরীর। স্রোতধারা সে লতাগুল্মকে ভেদ করে গড়িয়ে পড়ছে ভুমিতে।

হাকালুকি

বর্ষাকালে হাকালুকি হাওরের বিল ও নদীগুলো একীভূত হয়ে রূপ ধারণ করে সাগরের ন্যায় এক বিশাল জলাশয়ের। এ সময় হাওরের বিলের পার ও কান্দায় বিদ্যমান জলাভূমি, বন-পানির নিচে ডুবে গিয়ে সৃষ্টি করে ডুবন্ত বন এবং ব্যবহৃত হয় মাছের আশ্রয়স্থল হিসেবে। বর্ষাকালে হাওরপারে বসবাসরত মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয় এক অন্য রকম উন্মাদনা। যোগাযোগ ব্যবস্থা হয় সহজ। যোগাযোগের বাহন হিসেবে স্থান করে নেয় দেশীয় দাঁড়বাহী ও ইঞ্জিনচালিত নৌকা। জেলেরা মেতে ওঠে মাছ ধরার উৎসবে। বিভিন্ন প্রকার সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান এই সময় অনুষ্ঠিত হয়। হাওরের জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডারও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বিভিন্ন ধরণের উদ্ভিদ ও প্রাণী পাওয়া যায় এই হাওরে।

টাঙ্গুয়ার হাওর

টাঙ্গুয়া হাওড় নামে পরিচিত টাঙ্গুয়ার হাওড় এদেশের অন্যতম জলাভূমি যেটি আন্তর্জাতিকভাবেও বহুলভাবে সমাদৃত। প্রায় ৪৬টি গ্রামসহ গঠিত এই হাওড়ের আয়তন প্রায় ১০০ কিলোমিটার যার মধ্যে ২৮০২.৩৬ হেক্টর এলাকা হল জলাভূমি। প্রায় ৪০০০০ মানুষ এই হাওড়ের ওপর জীবিকা নির্বাহ করে। এখানকার প্রাকৃতিক সম্পদের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের কারনে সৃষ্ট নাজুক অবস্থার দরুন বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৯ সালে টাঙ্গুয়ারহাওড়কে পরিবেশগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০০ সালে এই হাওড়কে রামসার সাইট অর্থাৎ আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই ঘোষণার কারনে সরকার এই হাওড়ের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে বাধ্য থাকবে এবং সরকার এই মর্মে ইতিমধ্যেই কিছু পদক্ষেপ গ্রহন করেছে।

# জাফলং দেখার আগে মাধবকুন্ড দেখা উচিত বলে আমি মনে করি। জাফলং দেখবেন লাষ্টের দিন, যখন ফিরবেন তখন যেন চোখে জাফলং ভেসে থাকে।

# জাফলং যান আর মাধবকুন্ড যান, যেখানেই যান, পানিতে আপনি নামবেনই, তাই কাপড়-চোপড় সাথে রাখবেন। ভাড়াও পাবেন তবে নিজেরটাই ব্যবহার করা উচিত।

# মাজারে যাবেন কিন্তু লক্ষ রাখবেন আপনার সব ভক্তি যেন আল্লাহর প্রতিই থাকে। সব আল্লাহর ইচ্ছায় হয়, মাজারে গিয়ে মাথা ঠেকাবেন না।



আরও পড়ুন...

Quick Search