আমাদের দূর্গাপূর ভ্রমণ

  • Jahangir Alam Shovon 532 24/08/2017

আমাদের দূর্গাপূর ভ্রমণ

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

গত ৪ সেপ্টেম্বর নেত্রকোনার দূর্গাপুর ভ্রমনে গেলাম বিশাল এক গ্রুপ। প্রায় ১৫০ জনের বেশী দল নিয়ে ভ্রমনে যাওয়ার অভিজ্ঞতা বিরল। দলে বেশী মানুষ হলে প্রতিযোগিতা বেড়ে যায় সিট এবং খাবার নিয়ে ফলে বন্ধুত্ব তৈরী হওয়ার বদলে ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে যায়। নতুনদের সাথে তৈরী হওয়ার বদলে সবাই তখন পূর্ব পরিচিতদের সাথেই সময় কাটাতে পছন্দ করে। সে তুলনায় ১৫-২৫ জনের ট্যুর হলে ভালো। এটাই মনে হয়েছে আমার এই ট্যুর শেষে। আজকের এই ভ্রমণকাহিনীতে কোনো সাহিত্যরস কিংবা অতিরঞ্জন থাকবেনা। যাতে আপনারা বিষয়টি থেকে কোনো ধারণা পেতে পারেন।

তবে আমরা ঢাকা থেকে গিয়েছি ১৭ জন। ময়মনসিংহ থেকে দেড়শ পর্যটক যুক্ত হলো। স্পটে আনন্দ হলেও পথের কষ্টগুলোর কথা আজ লিখবো। যাতে আপনারা ভ্রমণে গেলে বিষয়গুলো খেয়াল রাখেন। কোনো ভ্রমণে আমি নিজে লিডে থাকলে কম চিন্তায় থাকি। কারণ আমি সমস্যাগুলো মাথায় রেখে সব ব্যবস্থা করি। অন্যের নেতৃত্বে গেলে ভয়ে ভয়ে থাকি। কোনটা আবার উল্টাপাল্টা হয়। আমার নিজের জন্যনা যতটা ভয় তার চেয়ে বেশী ভয় সাথে কাউকে নিলে। আমি নিজে যেকোনো পরিস্থিতি মেনে নিতে পারি। কিন্তু সহযাত্রী তেমনটা নাও করতে পারেন।

শফিক সাইফুল ভাই পেশায় প্রকাশক। তার অনেক দিনের ইচ্ছে আমার সাথে ঘুরতে যাবেন। বলতেই রাজি হয়ে গেল। তারহয়ে আমি ময়মনসিংহ থেকে দূর্গাপুর পর্যন্ত পিকনিক চাঁদা ৪শ করে ৮শ দিয়ে দিলাম। ঢাকা থেকে যারা আয়োজন দেখভাল করছে। ২/৩ জন জুনিয়র ছেলে। প্রথমে তারা ১৪ জনের জন্য টিকেট নিয়েছে। পরে লোক হয়ে গেছে ১৭ জন। কিন্তু ট্রেনের টিকেট আর পাওয়া গেলনা। এই অবস্থা দেখে শফিক সাইফুল ভাই স্টেশান থেকে বাসায় ফিরে গেলেন। আমি বেশী রিকুয়েস্ট করেনি। কারণ টিকেট কাটা হয়েছে শোভন আসনে। শোভন চেয়ারে হলে যেভাবে যাওয়া যেত। শোভন আসনতো আরামদায়ক নয়। খাড়া সিট, শক্ত, কারো মেরুদন্ডের ব্যথা থাকলে তার খবর আছে। আর সিট ছাড়া যাত্রীর যন্ত্রণাতো আছেই।

 নেত্রকোণা, ময়মনসিংহের দিকে বিশেষ করে স্বল্পআয়ের মানুষরা টিকেট ছাড়া বা সিটছাড়া টিকেট নিয়ে ট্রেনে উঠে পড়েন। সাথে বৃদ্ধ ও নারী সবাই যেন এটাকে মেনে নিয়ে উঠেন। যতবারই সে রুটে ভ্রমণে গেছি ততবারই বৃদ্ধাদের সিট ছেড়ে দিয়ে নিজে দাঁড়িয়ে গেছি। মাঝে মাঝে মনে হয় তারা যখন ইচ্ছে করেই বিনা টিকেটে বা সিট ছাড়া টিকেটে দাঁড়িয়ে যাওয়ার জন্য অভ্যস্ত তাহলে আমার সমস্যা কোথায় কিন্তু পরে আর সেটা চোখে দেখে মেনে নিতে পারিনি।

ট্রেনে উঠে দেখলাম। মধ্যবয়সী নারী, ছয়মাসের শিশুকোলে এক তরুনী মা, একাধিক বয়স্ক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিস্বরুপ ট্রেনে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর ১১টার ট্রেন ১টায় আসলো সেকথা নাইবা বললাম। ওই সিটের প্যারাতে আর চোখের লজ্জাতে বেশীরভাগ রাস্তা ওই মধ্যবয়সী মহিলা আর তরুনী মাকে বসতে দিয়ে দাঁড়িয়েই গেলাম। ছেলেরাও খোশগল্পে বসে দাঁড়িয়ে একসময় ময়মনসিংহ চলে আসলো। রাত মনে হয় সাড়ে ৩টা।

কাছেই পরিচিত একটা বাসায় রেস্ট নিতে গেলাম। রেস্ট মানে ঘুম টুম না। একটা ফ্রেস হওয়া। কারণ ভোর ৬টায় লোকাল ট্রেনে আমরা যাবো বারসিতে। ওখান থেকে নৌকায় করে বিজয়পুর। ঘন্টাখানের লেট করে ট্রেন ছাড়লো। স্থানীয়রা ফুরফুরে থাকলেও আমরা যেহেতু রাতে ঘুমুতে পারিনি আমরা কিছুটা ভাঙাচোরা টাইপের ছিলাম। তবুও ভ্রমণের আনন্দ সবকিছুকে ছাপিয়ে গেল। আয়োজকরা হাতে একটা করে লাল গোলাপ দিয়ে শুভেচ্ছা জানালো। ব্যাপারটা ভালোই লাগলো। বারসিতে নেমে ছোট গ্রামের বাজার দেখতে ভালো লাগলো। এখান থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার একমাত্র পথ লোকাল ট্রেন। দিনে চারবার চলাচল করে। অন্যপথও আছে কিন্তু সড়কপথে গ্রামীণ আকাবাঁকা এবড়েথেবড়ে রোড ধরে এই বষায় সিএনজিতে করে কেউ নাকি চলাচল করেনা।

এখানে নতুন একটি ব্রীজ নদীর বুকে শুয়ে আছে বুক চিতিয়ে। তার নিচে মোটামোটি বড় একটি কাঠের নৌকায় লাইন ধরে উঠলো সবাই। বেশ সময় লাগলো। নারীরা নৌকার ভেতরে আর সাহসী ছেলেরা নৌকার ছাদে বসে হৈচৈ করে সময়টোকে উপভোগ করছিলো।

এর মধ্যে উদ্যোক্তারা খিচুড়ির প্যাকেট আর পানির বোতল দেয়া হলো উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে। ময়মনসিং ব্লাড সোসাইটি নামক একটি সামাজিক সংগঠন এর পিকনিক এর আয়োজক। সবাই ক্ষুধার্ত ছিলো। তাই সাধারণ খিচুড়ি অমৃতের মতো করে খেলো আর প্লাস্টিকের প্যাকেটগুলো নদীতে ভাসিয়ে দিলো সাথে পানির বোতলও। সারিবদ্ধভাবে সেগুলো ভেসে চলেছে। এই দৃশ্য অনেককে আনন্দ দিলো। কেবল আমি ছাড়া।

কয়েকজন তরুনকে বললাম। ভাই আপনার মানবতার সেবক। মানুষের জন্য রক্ত দিয়ে সহযোগিতা করেন। আপনারা যদি এভাবে নদীর পরিবেশকে নষ্ট করেন। তাহলে দেশ পরিবর্তন হবে কিভাবে। ওরা এমনভাবে তাকালো মনে হলো খুব খারাপ কথা বলেছি। একজন বলল আপনি ঢাকা থেকে আসছেনতো..., সেও মৃদৃ হাসলো। অন্যরা খুব তাচ্ছিল্যভরে তাকালো। আরেকজন বলার পর তিনি কথাটা শুনেছেন বলে মনে হলো না। আমার ছোট একটা ব্যাগ। বিশেষ করে একদিনের ট্যুরে আমি সেটা ব্যবহার করি। আমি প্লাস্টিকের প্যাক গুলো মুচড়ে ব্যাগে পুরে নিলাম। আয়োজকদের দুজনকে বিষয়টা বললাম। একজন কোনো জবাব দিলনা যেন এটাই এখানে স্বাভাবিক। আরেকজন অবশ্য বলল ‘‘ আসলে বিষয়টা মনে ছিল না, আগেই বলে দিলে হতো’’

ঘন্টা তিনেক ধরে নৌকা চলল। একময় নৌকা এসে পড়লো সোমেম্বরী নদীতে। দুপাশে সবুজ, বালুময় স্রোত আর নদীর বুকে জেগে ওঠা বালুচড়ার পাশ দিয়ে এগিয়ে চলেছে যান্ত্রীক নৌকা। বেশ কয়েকবার নৌকার তলা ঠেকে যেতে যেতে একবার সত্যি ঠেকে গেলো। অনেক কষ্টে আলগা করা হলো।

নদীতে পাল তুলে পেরিয়ে যায় ছোট ছোট নৌকা। স্থানীয় লোকজন মাছ ধরার চেষ্টারত। কেউবা হাতজাল দিয়ে পাথর নুড়ি তুলছে। বেচে দুপয়সা পাবে বল্  আর সারি সারি নৌকায় নুড়ি পাথর তুলছে মোটর দিয়ে তা আবার জালে ছেকে ভরে নিচ্ছে নৌকায়। এখানকার বালিও যায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

এসে নামলাম বিজিবি ক্যাম্পের সাথে লাগানো ঘাটে। সুন্দর পরিপাটি জায়গা শীতল পাটির মতো রাস্তা। প্রথমে আসাযাওয়া ২/২ চার কিলোমিটার পথ হেঁটে বিজয়পুর সীমান্তে গেলেন সবাই। এখানে কোন তারকাটা বেড়া নেই। সাদা পতাকা আর বিএসএফ এর টহল দেখে আপনাকে বুঝতে হবে রাস্তার বাপাশে ভারত। জিরোপয়েন্টে গেলে ভারতের একটি ছোট বাজার সেখানে স্টেটব্যাংকের একটি শাখাও আছে। আলাপ হলো বিজিবি এবং বিএসএফ জওয়ানদের সাথে। উভয়ের মধ্যে ভাতৃত্বমূলক সম্পর্ক দেখে ভালো লাগলো। বিএসএভ জওয়ানরা লাইন ক্রস করতে দেয়নি তবে তাদের ক্যাম্প থেকে পানি এনে খাওয়ালো।

খুব খিদে লাগলো বাজার থেকে কারো মাধ্যমে কিছু কিনে খেতে চাইলাম। বিএসএফ রাজি হলো। কিন্তু বিজিবির ভাইয়েরা বললেন। না এটা ঠিক হবে না। তাছাড়া বাংলা কারেন্সিতো ওপারে চলবেনা। যদিও আমরা সবাই জানি সীমান্ত এলাকায় ২ দেশের মুদ্রাই চলে।

ফেরার পথে দেখলাম। স্থানীয় গারো নারীরা তাদের ঝুড়িতে করে ভারতীয় মাল পাচার করছে বর্ডার দিয়ে। সাবান, বিস্কুট চিপস এসব তারা ওপার থেকে এনে এপারে বিক্রি করেন। কয়েকজন সাবান বিস্কুট এবং জুতো বিক্রি করবে আমাদের লাগবে কিনা জানতে চাইলো।

এখানকার দোকানপাটেও দেখলাম বেশখোলামেলাভাবে ভারতীয় পন্য বিক্রি হচ্ছে। জিরো পয়েন্ট থেকে ফিরতে ফিরতে প্রচন্ড ক্ষুধা লেগে গেল। তাই খাবারের জন্য ছুটলাম স্থানীয় ইউপি কার্যালয়ে কারণ এখানে আমাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে গিয়ে ঘন্টা দেড়েক অপেক্ষা করার পর খাবারের প্যাকেট পেয়ে খেয়ে নিলাম। সেখান থেকে গেলাম চীনামাটির পাহাড়ে।  চীনামাটির পাহাড় দেখে ফিরে এলাম নৌকায়। নদীর পাড়ে বিভিন্ন খেলাধুলা শেষে নৌকায় উঠলাম। আমার খুব গোসল করতে ইচ্ছে হলো নদীতে কিন্তু সঙ্গী না পাওয়ায় তা আর হলো না।

আকাশে সুন্দর চাঁদ। রুপালী নদীর বুকচিরে চলছে নৌকা। সে এক বিরল দৃশ্যের অবতারণা হলো। আড়াই ঘন্টা সময় নিয়ে স্রোতের অনুকুলে আমরা বারসি বাজারে এসে পৌছলাম। এখানে এসে মসজিদের পুকুরে গোসল করলাম। গোসলের আগে সাবার কিনতে গেলাম। দোকানে বেশীরভাগ ভারতীয় সাবান। খুজে দেশী সাবান কিনে তা দিয়ে গোসল সারলাম। সাথে কয়েকজন যোগ দিলো।

আমাদের সাথে কয়েকজন চাইলো দ্রুত তারা ঢাকায় ফিরবে। কিন্তু এই সময়ে এখানে ট্রেনেই সেরা অবলম্বন তাই তাদেরকেও ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে হলো। গ্রামের বাজারে কিছু খেয়ে নিলাম। রাত ১০ টায় ট্রেন আসলো ১১টায় ছেড়ে দিলো ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে। রাত ১টা নাগাদ আমরা এসে পৌছলাম।

একদিনের ভ্রমণে এতটা দূর্বল আর কখনো হয়নি। এমনকি যেদিন পায়ে হেঁটে শহীদ মিনার থেকে স্মৃতিসৌধে গিয়েছিলাম সেদিনও নয়। সম্ভবত বসার অসুবিধার কারণে এবং গরমে এমন হয়ে থাকবে। আমি চাইলাম। আমার যে গেষ্ট আসেনি তার জন্য আমার দেয়া ৪০০ টাকা ফেরত নিতে। কারণ আমাদের ১৪ জনের জায়গায় যেহেতু ১৭ জন এসেছি। সেহেতু ৩জনের বাড়তি চাঁদাতো তারা পাচ্ছে। সেটা অফেরতযোগ্য বলে জানানো হলো। আবার তাদের নাকি বাজেটে শট পড়েছে তাই আমি আর আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে গেলাম না।

ময়মনসিংহে ওই সময়ে বাস মিলবে কিনা। তাই আমরা আমাদের ১৭ জনের জন্য আগেই একটা বাস রিজার্ভ করে রেখেছি। আশংকা ছিলো সকালে গিয়ে অফিস ধরতে পারবো কিনা। শেষ পর্যন্ত রিজার্ভ বাসে রাতের চারটায় ঢাকায় আসতে পেরেছিলাম।

আমার সাথে যারা ছিলো তাদের অনেকেই আমরা গত মে মাসে প্রচন্ড গরমের মধ্যে নৌকায় চড়ে সেন্টমার্টিন গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে আমরা সেন্টমার্টিন দ্বীপ পরিষ্কার করেছি এবং সেখানকার লোকদের ব্লাড গ্রুপিং করেছি। তারা সবাই একবাক্যে বলল। আমাদের সেন্টমার্টিন ট্যুর এত কষ্টের ছিলনা। সম্ভবত একরাতে ঘুমমেরো যাওয়া পরের রাতে ঘুম মেরে ফিরে আসার কারণে এমনটা হয়ে থাকতে পারে। আর ট্রেনের সিটের সমস্যাতো আছেই।

তবে সেখানে তোলা সবুজের সমারোহ ছবিগুলো ভীষণ সুন্দর হয়েছে। অনেকদিন ভালোলাগার অনুভূতি দেবে ছবিগুলো।  

 

 

 



আরও পড়ুন...

Quick Search