Five years of Panchagarh

  • Jahangir Alam Shovon 927 08/08/2017

পাঁচ গড়ের পঞ্চগড়

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়। গত ১২ ফ্রেব্রুয়ারী আমার দেশদেখা কর্মসূচীর সূচনা হয় এই জেলা থেকেই। তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা থেকে শুরু করে প্রায় তিন দিন লেগে যায় পঞ্চগড় পার হতে। উত্তরের জেলা হিসেবে এর চিত্র কল্পনা করতে গিয়ে যতটা রুক্ষতা মনে করা হয় বাস্তবে পঞ্চগড় অতটা রুক্ষ নয়। বরং শীতের শুরু ও শেষের দিকে গেলে আরামদায়কই মনে হবে।

পঞ্চগড়ের মুগ্ধতার অনেক কিছুই মিলবে। মিলবে গরুর গাড়ি নিয়ে গাড়িয়াল ভাইয়ের পথচলা। শুকনো নদীতে পারাপারের দৃশ্য। ধান গম ভূট্টা আখ ক্ষেত্রের দিগন্তবিস্তৃত দৃশ্যপট। এখানকার চিরন্তন সহজ সরল মানুষদের সান্নিধ্যও ভালো লাগার মতো বিষয়। যদি কেউ প্রান্তিক জনগনের সাথে মিশে তাদের জীবন ও ধ্যান ধারনার সাথে পরিচিত হতে চান, তাহলে পঞ্চগড় ভালো স্থান।

(হঠাৎ করে দেখা হয়ে যেতে পারে গাড়িয়াল ভাইয়ের সাথে। ছবি: জাহাঙ্গীর আলম শোভন)

আগেকার দিনে গড় বলা হতো রাজ্য বা এলাকাকে। পঞ্চগড় বলা হয় পাঁচটি গড়ের জন্য। আজকাল আর সব কিছুর সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায়না। তবে যতটুকু পাওয়া ও জানা যায় তাতে পঞ্চগড়ের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও পুরনো সভ্যতার চিহ্ন বহনকারী অনেক উপাদানই রয়েছে। আর ভ্রমণ বা দেখার জন্য এগুলো সব সময় ভালো উপাদান। এবং দিন দিন শেকড় সন্ধানী মানুষের কাছে এগুলোর চাহিদা বাড়ছেই।

(তেতুলিয়ার মিস্টি ও সন্ধেশের সুনাম রয়েছে। ছবি: জাহাঙ্গীর আলম শোভন)

 

পঞ্চগড়ের প্রধান পাঁচটি পর্যটন এলাকা হলো:

এক. ভিতরগড়ঃ

পঞ্চগড় শহর থেকে কিলোমিটার উত্তরে বাংলাদেশ- ভারত সীমান্তের কাছে অমরখানা ইউনিয়নে অবস্থিত । প্রাচীন কালে উত্তরবঙ্গে বিভিন্ন সময়ে যেসব রাজ্যের কথা উল্লেখ রয়েছে সেগুলোর মধ্যে  ভিতরগড় রয়েছে। আয়তনের দিক থেকে ভিতরগড় দূর্গনগরী ছিল বাংলাদেশের প্রাচীন নগরীগুলোর মধ্যে বৃহত্তম। প্রায় ১২ বর্গমাইল স্থান জুড়ে ভিতরগড়ের অবস্থান সনাক্ত করা হয়েছে।

এই দূর্গ একই সময়ে নির্মিত হয়নি। ধারণা করা হয়, দূর্গের প্রাথমিক কাঠামোটি পৃথূ রাজা কর্তৃক আনুমানিক ৬ষ্ঠ শতকের দিকেই নির্মিত হয়। পরে পাল বংশীয় রাজাদের দ্বারা এই অঞ্চল অধিকৃত ও শাসিত হওয়ার কালে গড়ের বিস্তার ঘটেছিল।

  দুই: বদেশ্বরী মহাপীঠ মন্দির

বোদা উপজেলার বড়শশী ইউনিয়নে ২.৭৮ একর জমিতে অবস্থিত। এটি িএ দেশীয় হিন্দুদের কাছে পরম পূজনীয়। স্থাণীয় হিন্দুদের কাছে তীর্থস্থান।

 হিন্দু ধর্মের স্কন্ধ পুরানের মতে শীবের স্ত্রী দূর্গার দেহের ৫২টি খন্ডের মধ্যে বাংলাদেশে পড়ে ০২টি খন্ড নিক্ষিপ্ত হয়। একটি চট্ট্রগামের সীতাকুন্ডে এবং অপরটি পঞ্চগড় এর বদেশ্বরীতে। আর বিশ্বাসের ভিত্তিকে মন্দিরটি গড়ে ওঠে।মহামায়ার খন্ডিত অংশ যে স্থানে পড়েছে তাকে পীঠ বলা হয়। বদেশ্বরী মহাপীঠ এরই একটি। উক্ত মন্দিরের নাম অনুযায়ী বোদা উপজেলার নামকরণ  হয়েছে। করতোয়া নদীর তীর ঘেঁষে নির্মিত বদেশ্বরী মহাপীঠ মন্দিরটি এখন প্রত্নতাত্বিক ঐতিহ্যের নিদর্শন বহন করে চলেছে।

 

 তিন: সমতল ভূমিতে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠিত চা বাগানঃ

পঞ্চগড় জেলার সদর  ও তেঁতুলিয়া উপজেলায় সাম্প্রতিকালে সমতল ভূমিতে চা গাছের চাষাবাদ শুরু করা হয়েছে এবং তা দিনে দিনে প্রসারিত হচ্ছে। সাধারণতঃ উচুঁ পাহাড়ী ভূমিতে চা চাষ হয়ে থাকে। কিন্তু সমতল ভূমিতে এর চাষাবাদ বাংলাশের এ এলাকাতেই প্রথম শুরু হয়।েএর কারণ পাশ্ববরতী ভারতের জলপাইগুড়ি ও শিলিগুড়িতে এ ধরনের চা বাগান রয়েছে।

যেসব প্রতিষ্ঠান চা চাষে এগিয়ে এসেছে তার মধ্যে কাজী এন্ড কাজী টি এস্টেট, ডাহুক টি এস্টেট, স্যালিলেন টি এস্টেট, তেঁতুলিয়া টি কোম্পানী প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

চার: বার আউলিয়ার মাজার

বারো আউলিয়ার দেশ বলে আমরা চট্টগ্রামকে জানলেও আমাদের এবার জানতে হবে পঞ্চগড়ও বারো আউলিয়ার মাজার আছে। আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নে  প্রায় ৪৭.৭৩ একর জমিতে অবস্থিত। জানা মতে, আরব দেশাগত  ১২ জন আউলিয়া ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য উক্ত স্থানে বসবাস  করেন। এবং এখানেই রয়েছে ১২ জন আউলিয়ার সমাধি। সুফিজমে বিশ্বাসীদের জন্য এটি একটি তীর্থস্থান মুসলিমদের জন্য এটি সম্মানের জায়গা।

মাজার প্রাঙ্গণে জেলা পরিষদ কর্তৃক নির্মিত একটি ডাক বাংলো রয়েছে। প্রতি বৈশাখমাসের শেষ বৃহস্পতিবার এখানে ওরস অনুষ্ঠিত হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান হতে অগনিত ভক্তের পদচারণায় মুখরিত থাকে ওরস মোবারকের দিনটি।

পাঁচ: বাংলাবান্ধা

এটা বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের পয়েন্ট। যেখান থেকে ২০১৬ সালের ১২ ফ্রেব্রুয়ারী দেশ দেখা শিরোনামে এবং দেখবো বাংলাদেশ গড়বো বাংলাদেশ স্লোগান দিয়ে। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন এর সহায়তায় আমি আমার পায়ে হেঁটে দেশ দেখা কর্মসূচী শুরু করি। বাংলাদেশের সর্বউত্তরের সীমান্ত পয়েন্ট হিসেবে েএর যেমনি গুরুত্ব রয়েছে তেমনি গুরুত্ব রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর হিসেবে। সম্প্রতি এখানে ইমেগ্রেশন সেন্টার চালু হয়েছে। পার্সপোর্ট ও ভিসার মাধ্যমে এই স্থান দিয়ে ভারতে গমনাগমন করা যায়, যা আগে ছিলো না। মহানন্দা নদীর তীর ও ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন প্রায় ১০.০০ একর জমিতে ১৯৯৭ সালে নির্মিত হয় বাংলাবান্ধা স্থল বন্দর। উক্ত স্থান হতে হেমন্ত ও শীতকালে আকাশ পরিষ্কার থাকলে হিমালয়ের কাঞ্চনজঙ্ঘা শৃঙ্ঘ দেখা যায়। 

এছাড়া পঞ্চগড় জেলার অন্যান্য দরশনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে মির্জাপুর শাহী মসজিদ।আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামে অবস্থিত। ১৬৭৯ খ্রিষ্টাব্দে (সম্ভাব্য) নির্মিত ঢাকা হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে অবস্থিত মসজিদের সাথে মির্জাপুর শাহী মসজিদের নির্মাণ শৈলীর সাদৃশ্য । দোস্ত মোহম্মদ নামে এক ব্যক্তি এটির নির্মাণ কাজ শেষ করেন মর্মে জানা যায়। সমজিদের নির্মাণ সম্পর্কে পারস্য ভাষায় লিখিত একটি ফলক রয়েছে মধ্যবর্তী দরজার উপরিভাগে। ফলকের ভাষা ও লিপি অনুযায়ী ধারণা করা হয় মোঘল সম্রা্ট শাহ আলমের রাজত্বকালে এর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। মসজিদের নির্মাণ শৈলীর নিপুনতা ও কারুকার্যের জন্যই দর্শনার্থীদের এখনো আকৃষ্ট করে।

অমরখা্না ইউনিয়নে আছে ‘মহারাজার দিঘী’ একটি বিশালায়তনের জলাশয়। পাড়সহ এর আয়তন প্রায় ৮০০ Í৪০০ ফুট। ধারনা করা হয় পৃথু রাজা এই দিঘীটি খনন করেন। কথিত আছে পৃথু রাজা এই দিঘীতে আত্মহনন করেন। প্রতি বছর বাংলা নববর্ষে উক্ত দিঘীর পাড়ে মেলা বসে।

 

 রয়েছে  গোলকধাম মন্দির এর অবস্থান দেবীগঞ্জ উপজেলার শালডাংগা ইউনিয়নের শালডাংগা গ্রামে অবস্থিত। মন্দিরটি ১৮৪৬ সালে নির্মিত হয়। এ স্থাপত্য কৌশল গ্রীক পদ্ধতির অনুরূপ। বাংলাদেশে এ ধরনের স্থাপত্য নির্দশণ খুব একটা নেই।

আরো আছে রকস মিউজিয়াম, পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজ চত্ত্বরে ২০০০ খ্রিস্টাব্দে কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ নাজমুল হক এর প্রচেষ্টায় রকস্ মিউজিয়ামটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

এখানকার গ্রাম, গ্রামীন হাটবাজার সবই দুচোখে নতুত্বের আবহ তৈরী করতে পারে, শহুরে পরিবেশে যারা হাপিয়ে উঠেছেন তাদের কাছে। এমনকি পঞ্চগড় শহরও আপনার জন্য মেলে দিতে পারে নতুন দিগন্ত। করতোয়া নদী ও অন্যান্য শুকিয়ে যাওয়া নদী বসুমতির হাহাকার বাজিয়ে দিতে পারে কানে। শীতে এখানে শীতের আধিক্য গরমে গরমের প্রতাপ এসব কথা মাথায় রাখবেন যদি কেউ পঞ্চগড়ে বেড়াতে যেতে চান। অবশ্যই আপনি ম্যাপ দেখে ঠিক করে নেবেন কোনটা আগে দেখবেন, আর কোনটা দেখা শেষ করে কোথাও রাত্রি কাটাবেন। এখানকার সুস্বাদু মিস্টি পানি, সন্তা গরুর দুধ, দেশীয় চিনি, খাঁটি ঘানিতে ভাঙা সরিষার তেল, তৃপ্তিকর চা এসবও আপনার মন ভরাতে পারে।

(তেতুলিয়া ডাকবাংলোর সামনে রয়েছে এরকম একটি পিকনিক স্পট। ছবি জাহাঙ্গীর আলম শোভন)

দর্শনারথীদের জন্য পঞ্চগড় শহরে ডাকবাংলো ও বেসরকারী হোটেল রয়েছে। বেসরকারী হোটেলগুলো খুব ভালো না হলেও সরকারী বাংলা মোটামোটি ভালো আছে। এর মধ্যে তেতুলিয়ার বাংলালোটি বেশ পুরনো কুচবিহোরের রাজা এটি নির্মাণ করেছিলেন এখন অবশ্য তার পাশেই একটি আধুনিক বাংলো তৈরী হয়েছে।  একটি সরকারী বাংলো রয়েছে বারো আউলিয়ার মাজারের কাছেই। তবে এগুলোতে থাকার জন্য নিয়ম অনুযায়ী প্রশাশনের সম্মতি লাগে। তাই কখনো এগুলোতে থাকতে চাইলে। উপজেলা নিরবাহী অফিসারের সাথে আগেই যোগাযোগ করে রাখবেন। নিজের ন্যাশনাল আইডি কার্ডের কপি অবশ্যই সাথে রাখবেন।

 

উক্ত মিউজিয়ামে পঞ্চগড় জোর প্রত্নতাত্ত্বিক ও লোকজ সংগ্রহ রয়েছে প্রায় ১,০০০ (একহাজার) সংখ্যক এরও বেশী।



আরও পড়ুন...