মেঘ বলেছে যাব যাব 23/01/2016



প্রচণ্ড দাবদাহে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত, বিশেষ করে কলকাতার। একটু স্বস্তির জন্য মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে সামর্থবান সকলেই একযোগে হানা দিয়েছে দার্জিলিং। সেখানে এমন পরিস্থিতি যে তিল পরিমাণ জায়গা নেই, পরিণত হয়েছে এক ঘিঞ্জি শহরে! হোটেলগুলো লোকে ঠাসা, থাকবার মত সুবিধাজনক কোনো জায়াগা আর ফাঁকা নেই। যদিও দু-একটি জায়গা রয়েছে তো তার ভাড়া চড়ে গিয়েছে কয়েক গুন। ওদিকে মানুষের চাপে শীতও যেন পালিয়েছে। সার্বিক দিক থেকে পরিস্থিতি আমাদের প্রতিকূলে। পরিকল্পনায় না থাকলেও এক বেকারি দোকানদারের পরামর্শে হানা দিলাম পশ্চিমবঙ্গের গোর্খা অধ্যুষিত লাভা ও লোলেগাঁও নামের মনোরম দুটি পর্যটন কেন্দ্রে।

লাভা-লোলেগাঁও এর জন্য প্রথমে যেতে হলো কালিম্পঙ এবং সেখানে এক দিন অবস্থান করতে হলো। কালিম্পঙ-এর কয়েক ঘণ্টার অভিজ্ঞতা থেকে দুটি কথা না বললে যেন স্বস্তি মিলছে না- নিরিবিলি ছোট্ট শহর কালিম্পঙ, বৈচিত্রময় নানা জিনিস নিয়ে জায়গাটির বেশ খ্যাতি রয়েছে। তন্মধ্যে অন্যতম, সপ্তাহের শনিবারের বাজার। ভোর থেকে শুরু হয়ে বেলা সাড়ে এগারোটার মধ্যে শেষ হয়ে যায়। দূর থেকে পাহাড়িরা নিজ হাতে তৈরি হস্তশিল্প, উৎপাদিত নানা ধরনের পাহাড়ি সবজি ও ফসল এবং জঙ্গল থেকে আহরণ করা ফলমূলসহ হরেক রকমের জিনিসপত্রের পশরা সাজিয়ে বসে। বাংলাদেশে পার্বত্য অঞ্চলের বাজারগুলিতে যেমন দেখা যায়, ঠিক তেমন। একটি নির্দিষ্ট এলাকার জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় সম্পর্কে অবগতির জন্য বাজার হতে পারে অন্যতম উপাত্ত।

ভোরের আলো ফুটে বেরুবার আগেই উপস্থিত হলাম বাজারে। শহর থেকে পাকা রাস্তা নেমে গেছে প্রায় এক কিলোমিটার। পথের প্রান্তেই অবস্থিত বর্ণিল সে বাজার। স্থানীয় ঐতিহ্যবহী সব খাবারের দোকান খুলে বসেছে ললিত-নিতু দম্পতি। তাদের দোকানের সর্ব প্রথম খরিদ্দার হয়ে বসে পরি খোলা আকাশের নিচে পাতানো আসনে। সদ্য ভেজে তোলা লুচির সাথে আলুর দম সহযোগে নাস্তা- অতুলনীয়! কথায় কথায় অমাদের পরোবর্তী গন্তব্যের কথা জানতে পেরে তারা একটি চমৎকার গাইডলাইন তৈরি করে দিলেন। শুধুমাত্র দার্জিলিং এর বেকারি দোকানদারের পরামর্শ ছাড়া এর আগ পর্যন্ত লাভা-লোলেগাঁও এর ব্যাপারে তেমন কোনো তথ্য আমাদের নিকট ছিল না। এবার তার সাথে যুক্ত হলো ললিত-নিতুর গাইড লাইন।

বাস কাউন্টারে আগে থেকেই খোঁজ লাগানো ছিল, যে করেই হোক প্রথম সারির আসন চাই। চব্বিশ আসনের পরিপাটি ছোট্ট একটি বাস। ষাটোর্ধ্ব সুদর্শন চালক সময় মত গাড়ি ছেড়ে দিলেন। সমস্ত পথেই তার সাথে কথা হয়। জাতিতে গোর্খা হলেও হিন্দীতে তিনি যথেষ্ট পারদর্শী। নিজের বেলায় ততোটা না হওয়ায়, দেখা গেল কোনো কিছু বলার আগে প্রায় কথাই মনে মনে সাজিয়ে নিতে হচ্ছিল। তারপরও তার সাথে গল্প করার লোভ সামলানো যাচ্ছিল না। পাহাড়ি পথ, চালকের আসনে বসে লোক ওঠা-নামানোর কাজ তিনি নিজ খেয়ালেই করেন। হেলপারের মুখে একবারও শোনা গেল না- এ্যাই ডাইনে, এ্যাই বামে, সামনে প্লাস্টিক জাতীয় কথাবার্তা বা গতি কমবেশির সংকেতস্বরূপ দরজায় ধামাধাম দু-চারটি চর-থাপ্পর। চলার পথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার মত প্রায় প্রতিটি জায়গার সাথেই তিনি আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন।

স্বপ্নের মত গ্রাম লাভা ও লোলেগাঁও। উভয়ের মাঝে ব্যবধান প্রায় ত্রিশ কি.মি.। সুন্দর পথ, এঁকেবেঁকে প্রবেশ করেছে পাইনের ছায়া ঢাকা, মেঘে ঢাকা পরিবেশের মাঝে। মেঘ ছুটছে দ্রুত গতিতে। ঘণ্টা চারেকের মধ্যে বাস গিয়ে উপস্থিত হয় লাভাগাঁও-এ। দশ মিনিট বিরতির পর ছেড়ে দেয় লোলেগাঁও-এর দিকে। ইতিমধ্যে উচ্চতা সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় সাড়ে সাত হাজার ফুট ছাড়িয়ে গেছে। বাস চালকের মুখে তথ্যটি জানার পর শরীরে এক ধরনের শিহরণ অনুভূত হলো। দুই নয়, চার নয়, সাড়ে সাত হাজার ফুট বলে কথা!

লোলেগাঁও একটি গ্রাম। গ্রাম থেকে চল্লিশ মিনিট হাঁটার পর জঙ্গলের মাঝে প্রায় ১০০ মিটার দীর্ঘ একটি ঝুলন্ত কাঠের সেতু রয়েছে। যা লোলেগাঁও-এর অন্যতম আকর্ষণ। এপাড় থেকে ওপাড় যাওয়ার জন্য জনপ্রতি টিকিটের মূল্য ২৫ রুপি। শত বছরের পুরনো বৃক্ষগুলোর মাঝ দিয়ে আঁকাবাঁকা সেতু সামান্য বাতাসেই দুলে ওঠে। কলকাতা থেকে আগত এক কিশোরের কাছে ঝুলন্ত সেতু দেখার পরবর্তী অনুভূতি জানতে চাইলে, হতাশার সাথে ব্যঙ্গাত্মক অনুভূতি মিশিয়ে বলল, হ্যাঁ, যান গিয়ে দেখে আসুন, পঁচিশ টাকায় একেবারে ফাঁটিয়ে দিয়েছে! বোঝা গেল ওর প্রত্যাশা যা ছিল তা পূরণ হয়নি। হিমশীতল পরিবেশ, সামনে এবং পেছনে উভয় দিকে ছড়ানো পর্বতশ্রেণী। গ্রামের দীর্ঘ উঠানের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে রয়েছে বর্ণিল করে সাজানো একটি বুদ্ধ মূর্তি। মেঘের ভেলার দুরন্তপনায় দূর থেকে মূর্তিটি পরিস্কার করে দেখার সুযোগ একেবারে মিলতে চায় না। উঠান বা প্রাঙ্গণের আরেক দিকে মাত্র কয়েকটি খাবারের দেকানে পরিবেশিত হয় বিভিন্ন প্রকারের স্থানীয় খাবার। লোলেগাঁও ঘুরতে যাওয়া পর্যটকরা আর কিছু না হোক সেই মুখরোচক খাবারের পদগুলোর স্বাদ থেকে নিজেকে বঞ্চিত একেবারেই করতে চান না। পর্বতের চূড়া থেকে দূর দিগন্ত সামনে নিয়ে চা-নাস্তা খাওয়া, সে এক অভাবনীয় অনুভূতি! অধিকন্তু অনবরত মেঘেরা এসে ছুঁয়ে দিয়ে যায় সারা শরীর। হাতে গোনা দুই কি তিনটি থাকার হোটেল রয়েছে, দু-এক দিনের জন্য মেঘেদের সাথে সহাবস্থানের দারুণ বন্দবস্ত !

নির্দিষ্ট সময় পর ফিরে আসি লাভায়। গ্রামের অবস্থান একটি পর্বতের ওপর। চারিদিকে কেবল ফাঁকা উপত্যকা। মেঘের ভেলায় ক্ষণে ক্ষণে ভেসে যেতে থাকে উপত্যকার সবুজ বনানী, হরিয়ে যায় খোদ লাভাগাঁও। বাজেটের মধ্যে মিলে যায় কটেজের একটি কক্ষ। কাঠের তৈরি কটেজ, লম্বা বারান্দা সম্মুখের পাহাড় খাঁদ পর্যন্ত ছড়ানো। দৃষ্টি দীর্ঘ করে তাকালে মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দেয় কাঞ্চনজংঘার বরফ ঢাকা শ্বেত শরীর। পাশের কক্ষে জায়গা করে নিয়েছেন কলকাতা থেকে আগত স্বস্ত্রীক অমিতদা, তার পৈত্রিক ভিটা বাংলাদেশের নাটোর জেলায়। আলাপ পরিচয়ের পর্ব শেষে তার সাথে লম্বা আড্ডা। চেনা নেই, জানা নেই অথচ পরস্পরের অনুভূতি যেন কত দিনের অদেখা পরিজনকে কাছে পাওয়া। পাহাড় জঙ্গল ঘুরে বেড়ানো তার নেশা এবং পাখির ছবি তোলা শখ। দক্ষিণ এশিয়ার প্রাকৃতিক ভারসাম্য যে হুমকির মধ্যে পড়ে রয়েছে, সে বিষয়ে তিনি একমত, একই সাথে ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন।

লাভাগাঁও-এর সকালটা খুব সুন্দর। পর্বতের ওপাশ থেকে সূর্য আস্তে করে উঠে এলো, শ্বেত পর্বতের শরীরে মৃদু করে ঢেলে দিল তার সোনালী আভা। এরই মধ্যে চলে আসে ধোঁয়া তোলা এক মগ ব্ল্যাক কফি। সকালের নাস্তা খেয়ে বেড়িয়ে যাই আশপাশটা ভালো করে ঘুরে দেখার জন্য। অমিতদা সাথে করে নিলেন তার ক্যামেরা, বৌদির কাঁধে কফির ফ্লাস্ক আর আমাদের কাঁধে সারা দিনের চাহিদা মোতাবেক শুকনো খাবারের পোটলা। আমরা তুললাম পাহাড়, পর্বত আর ফুলের ছবি। অমিতদা খুঁজে বেড়ালেন পাখি। অত্যান্ত সুশৃঙ্খল এবং পরিস্কার জীবনযাপন গাঁয়ের মানুষের। ময়লা আবর্জনা ফেলার জন্য রাস্তার নির্দিষ্ট দূরত্বে রয়েছে ডাস্টবিন। পর্যটন নির্ভর ব্যবসাই তাদের প্রধান পেশা। প্রায় প্রতিটি বাড়ির সাথে দুটি-একটি করে ঘর রয়েছে যা পর্যটকদের থাকার উপযোগী করে গড়ে তোলা। এ ছাড়াও রয়েছে বেশ কিছু হোটেল ও রিসোর্ট। সুতরাং থাকার জায়গার কোনো সঙ্কট নেই। চাইলেই ছোট্ট গাড়ি রিজার্ভ করে ঘুরে বেড়ানো যায় গাঁয়ের আশপাশের দু-দশ মাইল। সৌজন্যে : রাইজিংবিডি

 

You might like