‘সুন্দরবন ভ্রমণ নীতিমালা’ চূড়ান্ত করেছে সরকার 17/02/2016



দর্শনার্থীদের মাত্রাতিরিক্ত ভ্রমণ নিয়ন্ত্রণে অবশেষে ‘সুন্দরবন ভ্রমণ নীতিমালা’ চূড়ান্ত করেছে সরকার। সুন্দরবনের ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পর্যটকদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা হবে গত কয়েক বছর ধরে আলোচিত এ নীতিমালার মাধ্যমে। নীতিমালায় সুন্দরবন ভ্রমণের ক্ষেত্রে পর্যটক, ট্যুর অপারেটর ও বন বিভাগের দায়িত্ব নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

নীতিমালা অনুযায়ী, সুন্দরবন ভ্রমণের কমপক্ষে তিন দিন আগে বনবিভাগ থেকে অনুমতি নিতে হবে, সর্বোচ্চ ৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের দোতলা লঞ্চ বা জলযান পর্যটকসহ সুন্দরবন ভ্রমণ করতে পারবে। দিনে একটি লঞ্চে সর্বোচ্চ ১৫০ ও রাতে ৭৫ জনের বেশি ভ্রমণ করতে পারবে না। কোনো ফিটনেসবিহীন লঞ্চ সুন্দরবনে প্রবেশ করতে পারবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে নীতিমালায়।

যেকোনো শর্ত ভঙ্গের জন্য ভ্রমণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লঞ্চ বা জলযানের সুন্দরবনে ভ্রমণের রেজিস্ট্রেশন বাতিল বা জরিমানা আদায় করার কথাও নীতিমালায় বলা হয়েছে।

বন অধিদফতরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. ইউনুস আলী বলেন, ‘গত জানুয়ারি মাসে সুন্দরবন ভ্রমণ নীতিমালার গেজেট জারি হয়েছে। পর্যটকদের কারণে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীর বসবাসের পরিবেশ যাতে নষ্ট না হয়, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ যাতে দূষিত না হয় নীতিমালায় সে দিকে নজর দেওয়া হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নীতিমালার মাধ্যমে সুন্দরবনে ভ্রমণ সীমিত করে আনা হচ্ছে তা নয়। বরং সব কিছু একটা নিয়মের মধ্যে আনা হয়েছে। নিয়ম মেনে যে কেউ ভ্রমণ করতে পারবেন।’

নীতিমালায় বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুন্দরবনে পর্যটক সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরিকল্পিত ও আকস্মিক ভ্রমণ দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে এবং সুন্দরবনের পরিবেশ বিনষ্ট করছে।

বন অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৭৮ সালে এক আদেশের মাধ্যমে সুন্দরবনকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা দেয় সরকার। সুন্দরবন বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলা জুড়ে বিস্তৃত। সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখণ্ড বনভূমি। ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার রয়েছে বাংলাদেশে।

সমগ্র সুন্দরবনকে ১৯৯২ সালে ‘রামসার সাইট (ইরানের রমসা থেকে শুরু হওয়া বিশ্বব্যাপী জৈবপরিবেশ রক্ষার একটি সম্মিলিত প্রয়াস)’ ঘোষণা করা হয়েছে। ১৯৯৭ সালে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভ করে।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের হালনাগাদ ফিটনেস সার্টিফিকেট ও বিআইডব্লিউটিএ-র নৌ চলাচলের অনুমতি ছাড়া পর্যটকবাহী জলযানকে সুন্দরবনে প্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না।

এতে বলা হয়েছে, সুন্দরবন ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্য অক্ষুণ্ণ রেখে সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত আকারে সুন্দরবন ভ্রমণ অনুমোদন করা যাবে। সুন্দরবন ভ্রমণের জন্য দর্শনার্থীদেরকে সরকার নির্ধারিত হারে ফি দিতে হবে। সুন্দরবন ভ্রমণের ন্যূনতম তিন দিন আগে বন কর্মকর্তার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। তবে বিদেশী পর্যটকদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করতে হবে।

সুন্দরবনের সীমান্তবর্তী এলাকার পর্যটন কেন্দ্র যেমন— করমজল, মুন্সীগঞ্জ বা এ ধরনের এলাকা ছাড়া সুন্দরবনের ভেতরে ভ্রমণ ও রাতযাপনের জন্য বিভাগীয় বন কর্মকর্তার পূর্ব অনুমতি নিতে হবে। সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকার পর্যটক ধারণ ক্ষমতার মধ্যে পর্যটক সংখ্যা সীমাবদ্ধ রাখা হবে বলেও নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।

সুন্দরবন ভ্রমণকালে প্রচলিত বন আইন, বন্যপ্রাণী আইনসহ সংশ্লিষ্ট বিধি এবং বনকর্মীদের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে, যেখানে সেখানে অবতরণ, বিচরণ, অবস্থান করা যাবে না। বনের ভেতরে আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো হাতিয়ার, ফাঁদ, বিষ ইত্যাদি ছাড়াও মাছ বা বন্যপ্রাণী শিকার বা ধরার সহায়ক কোনো সরঞ্জাম বহন করা যাবে না।

সুন্দরবন ভ্রমণকালে কোনো মাইক বা মাইক্রোফোন জাতীয় শব্দযন্ত্র বহন করা যাবে না। পর্যটকবাহী লঞ্চ চলাচলের জন্য নির্ধারিত রুট অনুসরণ করার কথা বলা হয়েছে নীতিমালায়।

সর্বোচ্চ ৫০ মিটার দৈর্ঘ্য পর্যন্ত দোতলা লঞ্চ বা জলযান পর্যটকসহ সুন্দরবন ভ্রমণ করতে পারবে উল্লেখ করে নীতিমালায় বলা হয়েছে, লঞ্চ বা জলযানে দিনে সর্বোচ্চ ১৫০ জন পর্যটক ও রাত্রিকালীন অবস্থানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৭৫ জন পর্যটক বহন করা যাবে।
পর্যটকবাহী লঞ্চ বা জলযান সর্বোচ্চ চার রাত পাঁচ দিন পর্যন্ত সুন্দরবনে অবস্থান করতে পারবে। গবেষণার জন্য বন বিভাগের অনুমতি সাপেক্ষে ন্যুনতম প্রয়োজন অনুযায়ী সুন্দরবনে অবস্থান করা যাবে।

ভ্রমণ নীতিমালায় বলা হয়েছে, অভয়ারণ্য এলাকায় ভ্রমণের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত আলাদা এন্ট্রি ফি দিতে হবে। সুন্দরবনে নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত অবস্থানের প্রয়োজন হলে নিকটস্থ বন কর্মকর্তাকে যুক্তিসঙ্গত কারণ জানিয়ে নির্ধারিত ফি দিয়ে অনুমতি নিতে হবে। কোনোভাবেই তা সর্বোচ্চ নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত হবে না।

সুন্দরবনে প্রবেশ করার পর জলে ও স্থলে কোনোভাবেই কোনো আবর্জনা ফেলা যাবে না, জলযানের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে।

হ্রাসকৃত ফির মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের ভ্রমণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানের নিজস্ব প্যাডে ভ্রমণকারীদের তালিকাসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। প্রতি ৩০ জন ছাত্র-ছাত্রীর অভিভাবক হিসাবে ন্যুনতম একজন শিক্ষক নিযুক্ত রাখার কথাও বলা হয়েছে নীতিমালায়।

সুন্দরবন এলাকায় সাগর, নদী বা খালের পানিতে নামা, গোসল করা ও সাতার কাটা থেকে বিরত থাকার কথা উল্লেখ করে নীতিমালা বলা হয়েছে, সুন্দরবনের প্রাণীরা ভয় পেতে পারে, তাদের জীবন সংকটাপন্ন হতে পারে ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকির সৃষ্টি হতে পারে এমন কোনো কর্মকাণ্ড বা আচার-আচরণ থেকে বিরত থাকতে হবে।

নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, স্বাভাবিক মাত্রার শব্দ সৃষ্টিকারী, কালো ধোয়া উদ্গীরণকারী বা ত্রুটিপূর্ণ কোনো জলযান পর্যটক পরিবহন করতে পারবে না। পর্যটকবাহী লঞ্চে সৌর শক্তি ব্যবহারে সচেষ্ট থাকা। সুন্দরবনের অভ্যন্তরে শব্দ সৃষ্টিকারী জেনারেটর বহন থেকে বিরত ও রাত ১০টার পর জলযানে ব্যবহৃত জেনারেটর বন্ধ রাখতে হবে।

অনুমতি ছাড়া পর্যটকবাহী জলযানে জীবিত গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া জাতীয় প্রাণী বা এসব প্রাণীর মাংস বা রেড-মিট বহন করা যাবে না।

প্রতিটি পর্যটকবাহী জলযানে কমপক্ষে একজন প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইড এবং ৪০ জনের বেশি পর্যটকের জন্য দু’জন গাইড রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

সুন্দরবনে ভ্রমণের জন্য প্রাপ্ত আবেদনের বিষয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। সুন্দরবন ভ্রমণের জন্য প্রবেশ ফি, জলযান রেজিস্ট্রেশন ফি ও অন্যান্য যেকোনো ধরনের আদায়যোগ্য ফি-র তালিকা বিভাগীয় দফতরে এবং পর্যটকদের প্রবেশ পথের স্টেশনে বন বিভাগকে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে।

পর্যটকদের কাছ থেকে বনকর্মীর আচরণ নিয়ে কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ বিষয়ে সাত দিনের মধ্যে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে বলে নীতিমালায় বলা হয়েছে।

সূত্র : দ্যা রিপোর্ট

You might like