নীল নদের উৎসের খোঁজে 15/02/2016



নীল নদ পৃথিবীর দীর্ঘতম নদী। নদীটা উগান্ডার ভিক্টোরিয়া লেক থেকে উত্পন্ন হয়ে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে ভূমধ্যসাগরে গিয়ে মিশেছে। স্পেক নদীটির উত্পত্তিস্থল হিসেবে চিহ্নিত করেন রিপন জলপ্রপাতকে। ১৯৫৪ সালে ওয়েন জলপ্রপাতে বাঁধ নির্মিত হলে রিপন জলপ্রপাত ডুবে যায়।

দেড়শ বছর আগেও আফ্রিকার অনেক অঞ্চলই ছিল ইউরোপীয়দের কাছে অনাবিষ্কৃত। ভূগোলবিদ আর পর্যটকদের কাছে তাই বরাবরই আফ্রিকা ছিল আকর্ষণীয়। বিশেষ করে নীল নদের উৎস ছিল এক মহারহস্য। সেটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করে বিফলও হয়েছেন অনেকেই। ১৮৫৬ সালে লন্ডনের রয়েল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি নীলের উৎস খুঁজে বের করতে এক অভিযানের বন্দোবস্ত করে

নীলের উৎসের সন্ধানে অভিযান
অভিযানে নেতৃত্ব দেন রিচার্ড বার্টন (১৮২১-১৮৯০) এবং জন হ্যানিং স্পেক (১৮২৭-১৮৬৪)। ১৮৫৭ সালের জুন মাসে আফ্রিকার পূর্ব উপকূলে পৌঁছেন তাঁরা। এখন জায়গাটা তাঞ্জানিয়ার অন্তর্গত। তারপর টানা পাঁচ মাস নীল নদ ধরে যাত্রা। পাড়ি দেন ৯৬০ কিলোমিটার। পৌঁছেন তাবোরা নামের এক জায়গায়। সেখানে গিয়ে তাঁরা জানতে পারেন, এর পশ্চিমেই আছে এক বিশাল লেক। তাঁরা সেই লেকটাও খুঁজে বের করেন। এটিই পরে পরিচিত হয়ে ওঠে টাঙ্গানিয়াকা লেক নামে। কিন্তু এর দক্ষিণে কোনো নদীই বয়ে যায়নি। অর্থাৎ এই লেক আর যা-ই হোক, নীল নদের উৎস নয়। তখন ১৮৫৮ সালের মে মাস। স্পেক-বার্টনদের শরীর-স্বাস্থ্যও বেশ খারাপ হয়ে পড়েছে। তাঁরা ঠিক করলেন, তাবোরায় ফিরে কিছুদিন বিশ্রাম নেবেন।

খুঁজে পেলেন স্পেক
তাবোরা থাকতে থাকতেই তাঁরা আরেকটি বিশাল লেকের কথা শুনলেন। এই লেক তাবোরার দক্ষিণে। কিন্তু তখন বার্টন ভীষণ অসুস্থ। অগত্যা ১৮৫৮ সালের আগস্টে বার্টনকে ছাড়াই রওনা দিলেন স্পেক। খুঁজেও বের করলেন লেকটা। বিশাল সেই লেকের নাম দিলেন ভিক্টোরিয়া লেক। দেখেশুনে স্পেক বুঝলেন যে ওটাই নীল নদের উৎস। খুশি মনে ফিরে এলেন তাবোরায়। বার্টনকে দিলেন সেই সুখবর। বার্টন কিন্তু স্পেকের কথা একদমই বিশ্বাস করলেন না। তাঁর কথা, ভিক্টোরিয়া লেক নীল নদের উৎস হতেই পারে না। দুজনে তাই নিয়ে ভীষণ ঝগড়া বাধিয়ে দিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁরা কোনো সিদ্ধান্তেই আসতে পারলেন না। তখন দুজনে অভিযানের পাততাড়ি গুটিয়ে ফিরে গেলেন ব্রিটেনে।

পাওয়া গেল উৎস
দুজনে একই সময়ে রওনা দিলেও একসঙ্গে ফিরলেন না। স্পেক লন্ডনে পৌঁছলেনও আগেভাগে। এসেই অভিযানের সব খবর জানালেন রয়েল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটিকে। বার্টন আসতে আসতে স্পেক তাঁদের আরেকটি অভিযানের জন্য রাজি করিয়ে ফেলেছেন। সে অভিযান হবে একা স্পেকের নেতৃত্বে। উদ্দেশ্য, নীল নদের উেসর রহস্যের চূড়ান্ত কিনারা করা। স্পেক সেই অভিযানে বের হলেন ১৮৬০ সালে। ১৮৬২ সালের জুলাই মাসে খুঁজে বের করলেন নীল নদের উত্পত্তিস্থল। ভিক্টোরিয়া লেকের দক্ষিণে অবস্থিত নীল নদের উৎস সেই জলপ্রপাতটির নাম দিলেন রিপন জলপ্রপাত। আর এভাবেই মীমাংসা হলো দীর্ঘদিন ধরে পৃথিবীবাসীকে অন্ধকারে রাখা নীল নদের উেসর রহস্যের।

জন হ্যানিং স্পেক প্রথমে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে চাকরি করেন। সেখানে বাধ্যতামূলক ১০ বছর কাটানোর পর চাকরি ছেড়ে দেন। ঠিক করেন, আফ্রিকা ঘুরে বেড়াবেন। নতুন নতুন জায়গা আবিষ্কার করবেন। আর সংগ্রহ করবেন বিরল সব পশুপাখি। শেষ পর্যন্ত অবশ্য জুড়ে যান বার্টনের অভিযানে। স্বভাবচরিত্রে স্পেক ছিলেন বার্টনের বিপরীত। রীতিমতো আচারনিষ্ঠ, গোঁড়া ধার্মিক।

রিচার্ড বার্টন ছিলেন একাধারে লেখক, ভূপর্যটক, বিজ্ঞানী ও কবি। অসাধারণ ব্যক্তিত্বের এই খ্যাপাটে ভদ্রলোকের মেজাজও ছিল বাজখাঁই। ভাষাতাত্ত্বিক হিসেবেও তিনি ছিলেন সুদক্ষ। কথা বলতে পারতেন ৩০টিরও বেশি ভাষায়। আরব সংস্কৃতির প্রতি তাঁর বিশেষ অনুরাগ ছিল। তিনি প্রায়ই সেখানকার পোশাক-আশাকও পরতেন। যেমন বার্টনের ব্যবহূত এই ফেজ টুপি ও নাগরা

প্রমাণ করলেন স্ট্যানলি
জন হ্যানিং স্পেক নীল নদের উৎস খুঁজে বের করলে, ১৯ শতকের সবচেয়ে বড় ভূপ্রাকৃতিক রহস্যের সমাধান হয়। অবশ্য এর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব স্পেকের নয়। তিনি নীল নদের উৎস খুঁজে বের করেন বটে; কিন্তু সেটিই যে নীল নদের প্রকৃত উৎস, তা নিশ্চিত করে প্রমাণ করতে পারেননি। পরে ১৮৭৫ সালে তা প্রমাণ করেন হেনরি মর্টন স্ট্যানলি (১৮৪১-১৯০৪)। এই হেনরি আবার শুধু পর্যটকই ছিলেন না, তিনি সাংবাদিকতাও করতেন।

বন্ধুত্বের অবসান
দুই বন্ধু বার্টন আর স্পেক একসঙ্গে গিয়েছিলেন নীল নদের উৎস খুঁজে বের করার অভিযানে। কিন্তু সেই অভিযান শেষ হয় তাঁদের তিক্ত তর্কে। ফিরে আসার আগে অবশ্য ঠিক করেছিলেন, ব্রিটেনে ফিরে তাঁরা গণমাধ্যমের সঙ্গে একসঙ্গেই কথা বলবেন। কিন্তু স্পেক আগেভাগে পৌঁছে আর ধৈর্য ধরতে পারলেন না। সবাইকে ঢাক পিটিয়ে জানিয়ে দিলেন, তিনি নীল নদের উেসর সন্ধান বের করেছেন। নীল নদের উৎস লেক ভিক্টোরিয়া। আরেকবার অভিযানে গিয়ে তিনি নদীটির উেসর একদম ঠিকুজি-কুলুজি নিয়ে আসবেন। পরেরবার যখন স্পেক সেটি করেও দেখালেন, তখনো বার্টন বিশ্বাস করেননি। তাঁকে ভুল দাবি করে তর্ক করে গেছেন। শেষ পর্যন্ত ঠিক হয়, তাঁরা প্রকাশ্যে বিতর্কে নামবেন। দিন-তারিখ-সময়-স্থান সবই ঠিক করা হলো। কিন্তু বিতর্কটা আর হয়নি। আগের দিন এক দুর্ঘটনায় মারা যান স্পেক।

সৌজন্যে : কালের কণ্ঠ

You might like