নান্দনিক বগুড়ার ঐতিহাসিকতা 26/09/2016



বগুড়া খুব বেশি বড় শহর নয় কিন্তু এই শহরটা অল্প সময়ের মধ্যেই উত্তরবঙ্গেরর সবচেয়ে জাকজমকপূর্ণ শহরে পরিণত হয়েছে । ইতিহাসের ভাঁজ খুলে ফেললে দেখা যায় যে মহাস্থানগড়েই এক সময় গড়ে উঠেছিল পুন্ড্রবর্ধন বা পুন্ড্রবর্ধন নগর নামের এক প্রাচীন বসতি। যিশুখ্রিস্টের জন্মেরও আগে এখানে সভ্য জনপদ গড়ে উঠেছিল প্রত্নতাত্ত্বিকভাবেই তার প্রমাণ মিলেছে। জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতাব্দি থেকে খ্রিস্টীয় ১৫ শতাব্দির মধ্যবর্তী সময়ে এই নগর এক সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে বিস্তার লাভ করে। বেশ কয়েক শতাব্দি পর্যন্ত এখানে অসংখ্য হিন্দু রাজা ও অন্যান্য ধর্মের রাজারা রাজত্ব করেন। এর ভেতর রয়েছেন মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সামন্ত রাজবংশের রাজারা। এরপর এখানে ধর্মীয় সংস্কার করতে আসেন ইসলাম ধর্ম প্রচারকরা। পরবর্তীতে কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে এসব নিদর্শণ । 

কিন্তু নতুন সাজে সাজছে ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়। কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসা আড়াই হাজার বছর আগের প্রাচীন বাংলার রাজধানী এই দর্শনীয় স্থানটি এখন আবাার  সেজে উঠছে নতুনরূপে। বাংলার প্রাচীন রাজধানী পুন্ড্রনগরের অসংখ্য পুরাকীর্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মহাস্থানগড়ে এখন চলছে সংস্কার কাজ। দর্শনার্থীদের জন্য নির্মিত হচ্ছে আকর্ষণীয় পিকনিক স্পটসহ বিভিন্ন স্থাপনা। প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এই অবকাঠামো নির্মাণ ও সংস্কার কাজে অর্থায়ন করছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)। যার ৮০ ভাগ কাজ এরইমধ্যে শেষ হয়েছে। যার ফলে এ বছর শীত মৌসুমের আগেই পর্যটকদের জন্য নতুন চেহারায় হাজির হচ্ছে ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়।

অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক আর ইতিহাসবিদ মহাস্থানগড়কে হারিয়ে যাওয়া কিংবদন্তীর নগরী পুন্ড্রবর্ধন বলে উল্লেখ করেছেন। বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ ৬৩৯ থেকে ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে পুন্ড্রনগরে এসেছিলেন। ভ্রমণের ধারা বিবরণীতে তিনি তখনকার প্রকৃতি ও জীবনযাত্রার উল্লেখ করে বর্ণনা করেন।

দশম শতকের মধ্যবর্তী সময়ে এখানে রাজত্ব করেন রাজা নরসিংহ বা পরশুরাম। কিংবদন্তী অনুযায়ী, রাজা পরশুরাম ছিলেন অত্যাচারী। তাকে উচ্ছেদ করে ইসলাম ধর্মের শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে আসেন হযরত শাহ সুলতান বলখী (রঃ) মাহী সওয়ার। ধর্ম প্রচারক শাহ সুলতান বলখী (রঃ) সম্পর্কে রয়েছে আশ্চর্য কিংবদন্তী। শোনা যায়, তিনি মহাস্থানগড় প্রবেশ করার সময় করতোয়া নদী পার হয়েছিলেন একটি বিশাল আকৃতির মাছের পিঠে চড়ে। এজন্য তার নামের শেষে উল্লেখ করা হয় ‘মাহী সওয়ার’।

বগুড়া-রংপুর মহাসড়ক ধরে উত্তরে যাওয়ার সময় বাসের জানালা দিয়ে তাকালেই চোখে পড়বে অস্বাভাবিক উচ্চ ভূমি। আরেকটু তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকালে গাছ-পালার সবুজ পেরিয়ে চোখে পড়বে দুর্গনগরীর প্রাচীর। দীর্ঘাকৃতির এই প্রাচীরই বলে দেয় সমৃদ্ধ সেই নগরবাসীরা নিরাপত্তাকে কতটা গুরুত্ব দিতেন। লাখ লাখ পোড়ামাটির ইট আর সুড়কি দিয়ে ১ বর্গমাইল এলাকাকে ঘিরে ফেলা হয়েছে। নিজের চোখে না দেখলে এ বর্ণনা বিশ্বাস করা কঠিন। দেয়ালের মতো যে বিশাল কাঠামো মহাস্থানগড়কে ঘিরে রেখেছে তার দৈর্ঘ্য ৫,০০০ ফুট, আর প্রস্থ ৪,৫০০ ফুট। সমতল ভূমি থেকে এ দেয়ালের উচ্চতা ১৫ থেকে ৪৫ ফুট।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে এখানে কয়েক দফা খনন ও সংস্কার কাজ করা হয়েছে। পর্যটকরা দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে পারবেন এই প্রাচীরের ওপর হেঁটে। ভ্রমণপিপাসুরা এখানে নির্বিবাদে ঘুরে বেড়াতে পারবেন। প্রাচীর ঘেরা এ অংশের ভেতরে অনেক চিহ্নিত স্থাপনা রয়েছে। বিভিন্ন রাজবংশের আমলে নির্মিত এসব পুরোনো ভবনের ধ্বংসাবশেষের বেশিরভাগই রয়েছে মাটির নিচে। বিভিন্ন সময়ে প্রত্নতাত্ত্বিকরা এসব খুঁড়ে তাদের পর্যবেক্ষণ সমাপ্ত করে আবার সংরক্ষণের তাগিদেই মাটি দিয়ে ঢেকে রেখেছেন। বর্তমান মহাস্থানগড়ের অন্যতম আকর্ষণ হলো হযরত শাহ সুলতান বলখী (রঃ) মাহী সওয়ারের মাজারটি। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মাজারটি জিয়ারত ও পরিদর্শন করতে আসেন। শুধু ইসলাম ধর্মাবলম্বীরাই নয়, অন্যান্য ধর্মের অনুসারীরাও এখানে আসেন প্রার্থনা করতে।

মহাস্থানগড় দুর্গপ্রাচীরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে এই মাজারটি অবস্থিত। সমতল ভূমি থেকে টিলার ওপর ওঠার জন্য রয়েছে অসংখ্য ধাপবিশিষ্ট সিঁড়ি। মাজার চত্ত্বরে রয়েছে একটি প্রাচীন কুয়া ও অনেকগুলো বেদি। এছাড়া অতিথিদের জন্য রান্নার জায়গা ও বিশ্রামের ছাউনিও রয়েছে।

এখানকার একটি মাত্র যে প্রাচীন মসজিদ পাওয়া গেছে তা সুলতান ফারুক শাহের রাজত্বকালে, ১৭১৯ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করা। ব্রিটিশ শাসনামলে এই মাজারটি থেকেই ফকির বিদ্রোহের কর্মসূচি পরিচালিত হতো। প্রতিবছর বৈশাখ মাসের শেষ বৃহস্পতিবার মাজারটি ঘিরে বিশাল এক মেলার আয়োজন হয়।

দেখার আছে অনেক কিছু  !!

মহাস্থানগড় দুর্গপ্রাচীরের উত্তর পাশে রয়েছে পিকনিক করতে আসা দলের জন্য নির্ধারিত জায়গা। এখান থেকে আরেকটু উত্তরে রয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের স্থাপনকৃত জাদুঘর। জাদুঘরে মহাস্থানগড় ও আশেপাশের অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা অসংখ্য প্রত্নতত্ত্বের নমুনা রয়েছে। মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও অন্যান্য রাজবংশের অসংখ্য স্মৃতিচিহ্ন এখানে যত্নের সাথে সংরক্ষিত  আছে। রয়েছে কালো পাথরে খোদাইকৃত দেব-দেবীর মূর্তি, ধ্যানমগ্ন বুদ্ধমূর্তি, নকশা করা ইট-পাথরের টুকরো ও মূল্যবান পাথরের অলঙ্কার। আরো রয়েছে বিভিন্ন ধাতুর তৈরি অস্ত্র ও পাত্র, মুদ্রা ও স্মারক। মহাস্থানগড়ের পূর্ণাঙ্গ মানচিত্রের দেখাও এখানেই মিলবে।

জাদুঘরের প্রদর্শন কক্ষের বাইরে রয়েছে সুদৃশ্য বাগান। বাইরের চত্ত্বরেও রাখা হয়েছে বেশকিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নমুনা। জাদুঘরের সীমানার পূর্ব পাশে রয়েছে গোবিন্দ ভিটা নামে পরিচিত একটি প্রাচীন স্থাপনা। ধারণা করা হয়, এখানে একটি বিষ্ণু মন্দির ও প্রমোদ ভবন ছিল। গোবিন্দ ভিটার পাশ দিয়েই বয়ে গেছে করতোয়া নদী। শোনা যায়, এই করতোয়া নদী এক সময় সুদূর ময়মনসিংহ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কালের বিবর্তনে এখন শুধু থেকে গেছে শীর্ণ একটি জলধারা। শুধু বর্ষাকালেই এতে দু-কূল উপচানো জলের ধারা দেখা যায়। গোবিন্দ ভিটার দক্ষিণে রয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের নিজস্ব রেস্টহাউজ। পূর্ব অনুমতি সাপেক্ষে এখানে থাকাও যাবে।

মহাস্থানগড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য প্রাচীন কীর্তি। সবকিছু দেখতে চাইলে হাতে সময় নিয়ে আসতে হবে। যেহেতু এখানে বৌদ্ধ, হিন্দুসহ আরো ধর্মের রাজত্বকাল অতিবাহিত হয়েছে, তাই সব ধর্ম ও সমাজের আদি সংস্কৃতির নমুনাই এখানে একসঙ্গে পাওয়া যাবে।

এখানে আরো রয়েছে মৌর্য শাসনামলের নান্দাইল দীঘি, গুপ্ত আমলের ওঝা ধনন্তরীর বাড়ি, চাঁদ সওদাগরের বাড়ি, বেহুলা-লখিন্দরের বাসরঘর, নরপতির ধাপসহ অসংখ্য প্রত্নস্থল।

কিভাবে যাবেন ?

ঢাকা থেকে খুব সহজেই সড়ক পথে বগুড়া যাওয়া যায়। রাজধানীর কল্যাণপুর, গাবতলী ও মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে একটু পরপর বাস ছাড়ে। এসআর, শ্যামলী, টিআর, হানিফ, বাবলু, শাহ ফতেহ আলীসহ আরো অনেক পরিবহন সংস্থার বাস চলাচল করে এই রুটে। সময় লাগে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা এবং ভাড়া পড়বে ৩৫০ থেকে ৭০০ টাকা। কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ট্রেনেও বগুড়া আসা যায়। বগুড়া শহরের হাড্ডিপট্টি বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে এবং দত্তবাড়ি থেকে টেম্পু অথবা সিএনজি অটোরিক্সায় চড়ে আধা ঘণ্টার মধ্যেই পা রাখা যাবে মহাস্থানগড়ে।

কোথায় থাকবেন ?

মহাস্থানগড়ে রাত যাপনের মতো তেমন ভালো কোনো হোটেল নেই বললেই চলে। তাই থাকার জন্য বেছে নিতে পারেন বগুড়া শহরের হোটেলগুলো। সব ধরনের ও মানের থাকা-খাওয়ার জায়গা পাবেন শহরে। ৫০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকায় রাত যাপনের উন্নত ব্যবস্থা হয়ে যাবে। বেছে নিতে পারেন শহরতলীর ছিলিমপুরে বগুড়া-ঢাকা মহাসড়কের পাশে হোটেল নাজ গার্ডেন, শহরতলীর চারমাথা কেন্দ্রিয় বাস টার্মিনালের পাশে হোটেল সেফওয়ে ও সেঞ্চুরি মোটেল, বনানীতে সিয়াস্তা কিংবা পর্যটন মোটেল, দ্বিতীয় বাইপাসে মাটিডালি মোড়ের কাছে ক্যাসেল সোয়াদ কিংবা বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথার কাছে শেরপুর রোডে মফিজপাগলার মোড়ে অবস্থিত ম্যাক্স মোটেল।

বগুড়ার বিখ্যাত খাবার :

বগুড়ার বিখ্যাত খাবারের তালিকায় অনেক খাবারের নামই রয়েছে । তন্মধ্যে বগুড়ার মিষ্টি দই সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত । বগুড়া এলে এখানকার প্রসিদ্ধ দই, ক্ষিরসা ও মহাস্থানগড়ের ‘কটকটি’ নিতে কেউ ভুলবেন না যেন !৷৶৶