টিকেট করার পরেও বিমানবন্দরে গিয়ে দেখলেন যাত্রীর তালিকায় আপনার নাম নেই কি করবেন? 22/08/2016



গত ১৫ আগস্ট ইত্তেহাদ এয়ারলাইন্সকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করেছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট। তাদের অপরাধ ছিল, ইত্তেহাদ এয়ারলাইন্স তাদের ফ্লাইটে ওভারবুকিং থাকার তথ্য যাত্রীকে না জানিয়েই, প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ না দিয়েই-তাদেরকে অন্য একটি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে স্থানান্তর করে দেয়। টিকেটে ফ্লাইটের সময় রাত পৌনে দশটা থাকলেও, বিমানবন্দরে এসে দেখেন ঐ ফ্লাইটে যাত্রীদের তালিকায় তাদের নাম নেই। আরো খবরাখবর নিয়ে তারা জানতে পারেন পরেরদিন ভোরে অন্য একটি এয়ারলাইন্সের (গালফ এয়ার) ফ্লাইটে স্থানান্তর করা হয়েছে তাদের। সবমিলিয়ে ৮ জন যাত্রীর সাথে এমন করা হয়। এতে বড় ধরণের হয়রানির মধ্যে পড়ে ঐ যাত্রীরা। শেষ পর্যন্ত ঘটনা গড়ায় বিমানবন্দরের ম্যাজিস্ট্রেটে কোর্টে। অনুসন্ধান করতে গিয়ে ব্যতিক্রম এক ঘটনার সন্ধান পেলেনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ ইউসূফ।

 

এখন কথা হলো এত বিস্তারিত নিয়ম-কানুন সব যাত্রীর পক্ষে জানা সম্ভব কি না? এ প্রশ্নের জবাবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ ইউসূফ বলছেন-

 

‘ইত্তেহাদের ক্ষেত্রে যাত্রী হয়রানরি অভিনব একটা পদ্ধতি আমরা পেলাম। তারা যখন কোন যাত্রীকে অন্য একটি এয়ারলাইন্সে শিফট করে দেবে তখন নিয়ম হলো, সেটা করার জন্য প্যাসেঞ্জারের মতামত নিতে হবে। ধরেন, আমি ইত্তেহাদে টিকেট করলাম। কারণ এটা আমার পছন্দের। আমি বিশ্বাস করি যে, এই এয়ারলাইন্সে ভ্রমণ করলে আমি নিরাপদে গন্তব্যে যেতে পারবো বা এই এয়ারলাইন্সের সেবা আমার পছন্দ। কিন্তু আপনি আমাকে অন্য একটা এয়ারলাইন্সে তুলে দেবেন- তা তো হবে না। সেক্ষেত্রে আবশ্যিকভাবে প্যাসেঞ্জারের মতামত নিতে হবে। তখন সে যদি রাজি হয়, তাহলে আপনি তাকে শিফট করাবেন। কিন্তু সেটা না করে, এখানে যেটা করা হয়েছে- ওভারবুকিং ছিল তাই সেন্ট্রাল অফিস থেকে (এমনকি লোকাল অফিসকেও জানানো হয়নি) প্যাসেঞ্জারকে শিফট করে গালফ এয়ারে দিয়ে দিয়েছে। সেটা প্যাসেঞ্জারও জানে না, এমনকি লোকাল অফিসও জানে না। না জানার প্রেক্ষিতে প্যাসেঞ্জার কিন্তু ঐ দুই এয়ারলাইন্সের টিকেটের মূল্যের যে পার্থক্য সেটাও জানতে পারলো না, তাকে স্থানান্তরের কারণে যে ক্ষতিপূরণ পাবার কথা সেটাও পেলো না, আবার ঐ এয়ারলাইন্স এর ফ্লাইটে সে যাবে কি না সেটাও বলতে পারলো না। সব মিলিয়ে ৩ ধরণের অনিয়ম হয়েছে। এটা অভিনব এ কারণে যে, চাইলেই আপনি কিন্তু তাদের অনিয়মটা বের করতে পারবেন না। তাদের সিস্টেমে যদি আপনি যান, আপনি যদি বলেন যে- বের করেন তো এই ফ্লাইট থেকে কয়জনকে শিফট করেছেন-সেটা কিন্তু তাদের সিস্টেমে আপনি পাবেন না। বুক লোড দেখবেন, সেখানে থাকবে যে কতজন যাচ্ছে অর্থাৎ কতজন এই ফ্লাইটে বুকড অবস্থায় আছে।

এতজনকে নিয়ে তারা গালফে শিফট করে দিলো। শিফট করে দেয়ার পর তাদের কিন্তু এই বুকলোডে কোন অস্তিত্ব নেই। ইত্তেহাদের সিস্টেমে এদের কোন খোঁজ পাবেন না। আমার ধারণা যেটা করা হতো বা হয়েছে তা হলো, কিছু প্যাসেঞ্জার আছে যারা যেতে পারলেই খুশী। প্রতিবাদ করবে তো দূরের কথা, যেতে পারলেই খুশি। তাদের ক্ষেত্রে এই সুযোগটা নেয় এয়ারলাইন্স। এটা তাদের হেড অফিস থেকে করেছে, যার খোঁজ কোথাও নেই। একমাত্র প্যাসেঞ্জারের টিকেট নম্বর দিয়ে ট্রেস করলে বুঝা যাবে যে, এটা অন্য জায়গায় শিফট করা হয়েছে।’

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ফ্লাইটে ওভারবুকিং সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিলেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ ইউসূফ। তিনি জানালেন, ওভারবুকিং কারা করতে পারবে সেটা একটা বিষয়। ওভারবুকিং সব এয়ারলাইন্স করতে পারবে না। কিছু কিুছু আছে বাজেট এয়ারলাইন্স আছে যারা কম দামে ওয়ান টাইম টিকেট বিক্রি করে-এটা মিস মানে একেবারেই মিস। আবার কিছু কিছু ভালো এয়ারলাইন্স আছে যাদের টিকেট মিস হলে, একবারে মিস না। এক বছর পর্যন্ত টিকেটটি আপনি ব্যবহার করতে পারবেন। কিন্তু যতবার আপনি ঠিক তারিখে আসবেন না বা মিস করবেন, ততবারই আপনাকে একটা চার্জ দিতে হবে। চার্জ দিয়ে টিকেটটি রি-ইস্যু করতে হবে। সেক্ষেত্রে ঐ যাত্রীর সিট খালি যাওয়ার কথা। তাতে এয়ারলাইন্সগুলো ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। এটার সমাধান হিসেবেই এয়ারলাইন্সগুলো ওভারবুকিং করতে পারে। তবে সেক্ষেত্রেও শর্ত আছে। দেখতে হবে যে, বিগত ৬ মাসে প্রত্যকটি ফ্লাইটে গড়ে কতজন করে যাত্রী অনুপস্থিত থাকে। ঠিক ঐ খালি সিটের সংখ্যা গড় করে, ঐ পরিমাণ ওভারবুকিং করার নিয়ম আছে এবং এটা মোট ধারণ ক্ষমতার ৫ শতাংশের এর বেশি হবে না। ধরা যাক, কোন ফ্লাইটে ৩০০ জন যাত্রীর ধারণ ক্ষমতা আছে। তখন ঐ ৩০০ জনের ৫% ওভারবুকিং করা যাবে।

এখন কথা হলো, যদি কোন ফ্লাইটে কেউই অনুপস্থিত থাকলো না। আবার ওভারবুকড প্যাসেঞ্জার চলে আসলো সবাই। সেক্ষত্রে কি হবে? সেটার ক্ষেত্রে তিনটি প্রক্রিয়া আছে। তার যে কোনটাই করার ক্ষেত্রে যাত্রীর সাথে আবশ্যিকভাবে কথা বলে নিতে হবে। আগাম কথা বলতে পারে বা প্যাসেঞ্জার কাউন্টারে গেলে কথা বলতে পারে। সরাসরি একটা খাম নিয়ে গিয়ে প্যাসেঞ্জারকে বলতে হবে যে- স্যার, আমরা আপনাকে ওভারবুকিং এর কারণে নিতে পারছি না। কিন্তু এটা বৈধ। এ জন্য আপনার সামনে কয়েকটি পথ/অপশন খোলা আছে। অপশনগুলো হলো-

(১) প্রথম প্রস্তবটা এমন হতে পারে- এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ যাত্রীকে বলবে, আমাদের পরবর্তী ফ্লাইট এই সময়ে, এই সময়ে আমরা আপনাকে নিয়ে যেতে পারি। যদি ঐ সময়ে আপনি যান, সেক্ষেত্রে আপনার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা আমরা করবো এবং এই পরিমাণ টাকা আপনাকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেবো। ইত্তেহাদের ক্ষেত্রে এই ক্ষতিপূরণ ২০০ ডলার বা ১৬ হাজার টাকার উপরে। এটা ইকনোমিক ক্লাসের জন্য। বিজনেস ক্লাসের ক্ষেত্রে ৩০০ ডলারের মতো। এটাকে বলে ডিনাইড বোর্ডং কমপেনসেশন বা ডিবিসি।

(২) তারপর দ্বিতীয় অপশন হিসেবে যাত্রীকে বলবে- আপনি চাইলে আমাদের ফ্লাইটে না গিয়ে আপনার শিডিউলের কারণে অন্য কোন এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে যদি যেতে চান, তাহলে অন্য কোন এয়ারলাইন্সে যদি সিট ফাঁকা থাকে আমরা আপনাকে সেটা ব্যবস্থা করে দেবো। সেটা দিয়ে আপনাকে গন্তব্যে পৌঁছাবো। এটা নির্ভর করে অন্য ঐ গন্তব্যে রুট থাকার উপর, এয়ারলাইন্স থাকার উপর এবং অন্য এয়ারলাইন্সে সিট খালি থাকার উপর। সেক্ষেত্রে ঐ দুই এয়ারলাইন্সের টিকেটের মূল্যে যদি পার্থক্য থাকে অর্থাৎ যদি পরবর্তী এয়ারলাইন্সের টিকেট কমমূল্যের হয়, তাহলে মাঝখানের গ্যাপটা আমরা আপনাকে দিয়ে দেবো। সাথে আপনি ডিবিসি হিসেবে ঐ ২০০ ডলার বা ১৬ হাজার টাকা পাবেন।

(৩) এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ যাত্রীকে বলবে- আমরা যেহেতু ওভারবুকিং এর কারণে আপনাকে পাঠাতে পারছি না, তাই আপনি উপরের দু’টি প্রস্তাবের কোনটিতে রাজী না হলে টিকেটের সম্পূর্ণ টাকাটা (কোন ধরনের চার্জ কাটা হবে না) তুলে নিতে পারেন। সেক্ষত্রে আমরা আপনাকে ডিবিসি’র ২০০ ডলার দিয়ে দেবো এবং রিফান্ড এর আবেদন করলে টিকেটের টাকাটা রিফান্ড পাবেন।

এখন কথা হলো এত বিস্তারিত নিয়ম-কানুন সব যাত্রীর পক্ষে জানা সম্ভব কি না? এ প্রশ্নের জবাবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ ইউসূফ বলছেন-

‘প্যাসেঞ্জার জানুক বা না জানুক, আপনি যে সেবার অঙ্গীকার করেছেন সেটা তো দিতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে আইনের প্রয়োগ না থাকার কারণে হয়রানি করাটা অভ্যাস হয়ে গেছে। প্যাসেঞ্জারকে সবকিছু জানতে হবে, এমন তো কোন কথা নেই। আর এত ইনফরমেশন রাখা প্যাসেঞ্জারের পক্ষেও সম্ভব নয়। যাত্রী একটা সেবার প্যাকেজ কিনেছে, তার মধ্যে কি কি আছে তা এয়ারলাইন্সগুলোকে অবশ্যই মেনে চলতে হবে। তবে নিজের অধিকারগুলো সম্পর্কেও যাত্রীদের ধারণা থাকতে হবে।

আমার কাছে যেটা মনে হয়- একটা লোয়ার ক্লাস এয়ারলাইন্স যখন অপকর্ম করে, তখন কিন্তু এগুলো অনেকটাই সবার চোখে ধরা পড়ে। কিন্তু  সফিসটিকেটেড এয়ারলাইন্সের ক্ষেত্রে দেখেছি তাদের চুরিটাও হয় সফিসটিকেটেড। খুব সহজে ধরা যায় না। আবার তারা হয়রানিও করে এমন যাত্রীদের যারা কোন প্রতিবাদ করবে না।

তাহলে এমন ঘটনার শিকার হলে যাত্রীরা কি করবে?

‘বিমানবন্দরের যে কাউকে বললে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট দেখিয়ে দেবে।’

 

 

সৌজন্যে: প্রবাস কথা