মেঘ থেকে লিখছি 07/06/2016



গ্যাংটককে বলা হয় মেঘের বাড়ি। সম্প্রতি সেখান থেকে ঘুরে এসেছেন জাফর হায়দার তুহিন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অভিজ্ঞতা টুকে রেখেছিলেন মেঘের বাড়িতে বসেই। তুহিনের সেই অভিজ্ঞতাগুলো পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল:

আমি লিখছি গ্যাংটক থেকে। ভারতের রাজ্য সিকিমের শহর গ্যাংটক। এখন ভারতের হলেও পঁচাত্তরের আগে এটি ছিলো স্বাধীন রাষ্ট্র। আমাদের স্বাধীনতার পর, অর্থাৎ পঁচাত্তর সালে স্বাধীন সিকিমকে ভারতের হাতে তুলে দেন তখনকার শাসক লেন্দুপ দর্জি।


 
অবশ্য চীন আর ভারত সীমার এই সিকিম নিয়ে গোলমাল ছিলো আগে থেকেই। চীন চাইতো না, সিকিম ভারতের সাথে চলে যাক। আর ভারত চাইতো স্বাধীন দেশটাকে নিজের করে নেয়ার। এ নিয়ে সিকিম ছিলো রণক্ষেত্র।
 
এখন অবশ্য তা নেই। চীন প্রকাশ্যে তাদের আপত্তি তুলে নিয়েছে। আর ভারতও সিকিম নিয়ে ভালোই আছে। তবে সমস্যাটা হলো আমাদের। আমাদের মানে, আমরা যারা বাংলাদেশী। শুধু বাংলাদেশীই নয়, পাকিস্তান, আফগানিস্তানসহ কয়েকটি মুসলিম দেশের নাগরিকদের জন্য সিকিম নিষিদ্ধ। আগে পশ্চিমাদের জন্যও ছিলো। তবে এখন তাদের জন্য দরজা খুলে দেয়া হয়েছে।


 
নেপাল থেকে সিকিমে এসে পৌঁছি বুধবার, ২৪ জুন। এসেই একরম চোর চোর ভাব নিয়ে থাকতে হচ্ছে। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে। অথচ সাদা চামড়ার পর্যটকরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন অবাধে। ভাবলাম ফিরে যাবো! এসে ফিরে যাওয়াটা ঠিক হবে না। বরং লুকিয়ে-চুরিয়ে কয়েকটা দিন থেকে যেতে পারলেই হয়। থাকতে তো ইচ্ছে হবেই। মেঘের বাড়িতে এসে কে আবার চলে যেতে চায়!
 
আমিও থেকে গেলাম। তবে পুলিশ এড়িয়ে। থাকলাম তো বেশ। কিন্তু রাতে ঘুমাবো কোথায়?
 
প্রশ্ন শুনে বলতে পারেন, কেন হোটেল আছে না?


 
আরে বাবা, হোটেল তো আছেই। কিন্তু হোটেলে আমাকে থাকতে দিলে তো! গ্যাংটক শহরজুড়ে গিজগিজ করছে হোটেল। চড়া দামের। সবচে কম খরচের হোটেলটাও এক রাতের জন্য দাম হাঁকে দেড় হাজার। আমি তাতেও রাজি। কিন্তু কোনো হোটেলওয়ালা আমাকে রাখতে রাজি না। সবগুলো হোটেল থেকেই ফিরিয়ে দেয়া হলো। কারণ আমি বাংলাদেশী।
 
সাধারণ মানুষের সাথে কথা বললাম। সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসেন অনেকেই। তবে বাংলাদেশী পরিচয় জানার পর থেকেই কেমন যেন পাল্টে যেতে থাকেন এরা। একটু অন্যরকম ভাব। আমাকে এড়িয়ে চলতে পারলেই যেন বেঁচে যান।


 
হোটেলে ঠাঁই জুটলো না। সাধারণ মানুষও এগিয়ে এলো না। তাতে কী, আমি তো রাস্তায় ঘুমুতেও অভ্যস্ত। ঘুরবো বলে যখন ঘর ছেড়েছি, তখন পথে ঘুমুনোর মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই এসেছি। কিন্তু এতেও সমস্যা। সিকিমের পুলিশ খুব কড়া। সতর্ক দৃষ্টি।
 
আমিও নাছোড়। কোনো না কোনোভাবে থেকে যেতেই হবে। মেঘের বাড়িতে এসে কেউ ফিরে যায় নাকি! লোকে শুনলে ছি ছি করবে না!
 
আমি ভীরে গেলাম তাবলীগ জামায়াতের একটি দলের সাথে। তারা সাদরে গ্রহণ করে নিলেন আমাকে। এর পর থেকে অবস্থান করছি মসজিদে। হুটহাট করে বেরিয়ে যাচ্ছি গ্যাংটকের পথে। পথকে আর আলাদা করে কী বলবো, আসলে পুরোটাই মেঘ।


 
পাহাড়ের ওপরের শহর। মেঘে ঢাকা স্বপ্নের শহর। যে কারো মনে হবে ওখানে যদি আমার একটা বাড়ি থাকতো।
 
এখন আছি মেঘের ভেতর। এই শহরে ২৪ ঘন্টাই মেঘের উড়াউড়ি। ১২ ঘন্টা মেঘগুলো আমাকে ঘিরে রাখে। অর্থাৎ আমি মেঘে ঢাকা। আবার ১২ ঘন্টা সাদা মেঘেরা কাছ ঘেঁষে উড়ে। পায়ের হাজার মিটার নিচ দিয়ে ভেসে যায়। কখনো দূরে নয়, কাছাকাছিই থাকে। অধিকাংশ সময় বৃষ্টি হয়ে ঝড়ে। তবে কখনে মুষলধারে ঝরতে দেখিনি। ছাতা ছাড়াই বৃষ্টিতে দিব্যি হেঁটে চলছি।


 
এই গ্যাংটক শহরটি দারুণ রকমের পরিষ্কার। রাস্তায় ময়লা ফেলা নিষেধ। এমনকি ঘরের বাইরে সিগারেট খেতেও মানা। পথ ও ফুটপাথগুলো সবসময় ধোয়া ও ভেজা থাকে। আবার সামনের শহরটা পরিষ্কার হলেও ভেতরে কিছু নোংরা তো আছেই। কিছু বাজার ও ফুটপাত আছে যেগুলোর অবস্থা একেবারের আমাদের দেশের চাইতেও বাজে।
আর এমনিতে ব্যস্ততম এলাকাগুলো সাধারণই। পথে পথে ভাস্কর্য। দেখেছি পথের মোড়ে বড় করে মহাত্মা গান্ধীর ভাস্কর্য বানিয়ে রাখা হয়েছে। পথ থেকে পথে ঘুরছি। অলি, গলি। পার্ক, মাঠ। স্টেডিয়ামে গিয়েছি ফুটবল খেলা দেখতে। গিয়েছি বাচ্চাদের স্কুলে। জুনিয়র ও সিনিয়র স্কুলগুলোতে পড়ালেখা চলছে বেদম। অধিকাংশ অভিবাবকরাই সন্তানদের শিক্ষার ব্যাপারে সচেতন।


 
আর সচেতন ছাত্ররাও। কয়েকজন আমাকে জানালো, তারা ভারতের সাথে থেকে খুশী। স্বাধীন সিকিম, চীন-ভারত বিবাদ এসব নিয়ে এখন আর কেউ চিন্তিত নয়। সবাই ভারতের সাথেই মিশে গেছে। তবে ব্যয়বহুল জীবনযাত্রা ওদের একটু ভাবায়। চাল থেকে শুরু করে আলু পর্যন্ত ভারতের অন্য রাজ্য থেকে আমদানি করতে হয় ওদের। এ কারণেই অন্য রাজ্যগুলো থেকে এখানকার চাকরির বেতনও ভালো পায় এরা।
 
আইন-কানুন কেমন?
তা হয় তো বুঝতেই পারছেন। আমার মতো টই টই করে ঘুরে বেড়ানো ছেলেও রাস্তায় ঘুমানোর সুযোগ পেলাম না। আমি কেন, ওখানকার রাজনৈতিক নেতারাও নাকি অন্যায় করলে পার পান না। এক মোটরসাইকেল আরোহী বুক ফুলিয়ে বললেন, মোটরসাইকেলের লাইসেন্স না থাকলে, আমার বাবা রাজনৈতিক নেতা হলেও আমাকে শাস্তি পেতে হবে।


 
বলে রাখা ভালো। বুধবার থেকে আমি মসজিদেই আছি। তবে টই টই করে ঘুরছিও। এরি মধ্যে ঘুরে এসেছি সিঙটাম থেকে। দেখেছি পাহাড়ি গ্রাম রঙপু। ঘুরে এসেছি তিস্তা নদীর উৎপত্তিস্তল থেকেও। হ্যাঁ সিকিম থেকেই এই তিস্তার উৎপত্তি। পরে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে এটি বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। কিন্তু প্রবেশ করলে কি হবে, পানি পাচ্ছি না আমরা। আটকে রাখা হয়েছে ভারতে। এদিকে আমরা বাংলাদেশে বসে তিস্তা তিস্তা করে গলা ফাঁটাচ্ছি। কিন্তু মোদি সাহেব কান দিচ্ছেন না।


 
আমি যদি এখন ওটা উৎপত্তিস্থল থেকেই বন্ধ করে দেই!
 
ক্রেডিট : জাফর হায়দার তুহিন