ভ্রমণ হোক ঢাকাতেই 24/05/2016



ভ্রমণ প্রিয় মন থাকতে চায় না ঘরে। কিন্তু বেরোলেই তো ভীষণ গরম। প্রচন্ড রোদে মূহুর্তেই পুড়ে যায় ত্বক, নেমে আসে ক্লান্তি, মেজাজটাও যায় বিগড়ে। গরম না থাকলে আবার দেখা যায় মুষলধারে বৃষ্টি, চারিদিকে প্যাচপ্যাচে কাদা। কিন্তু প্রতিদিনের একই রকম একঘেয়ে জীবনও তো ভাল লাগে না! মন চায় একটু ব্রেক নিতে। ভাবনাহীন নির্বিবাদ একটি দিন কাটাতে। কিন্তু কোথায় যাওয়া যায়!
 
গরমে, বৃষ্টিতে দূরের যাত্রার কথা ভাবতেই তো বেড়ে যায় ক্লান্তি আরও বহুগুণে! যদি ঢাকার কাছেই কোথাও বেড়িয়ে আসা যায়? বন্ধুরা মিলে সি এন জি অথবা বাসে শর্টকাটে বেড়িয়ে আসতে পারেন এমন কিছু জায়গার কথা বলব আজ। ভাবছেন আবার সেই সোনার গাঁও, পানামনগর? না। ধাকার কাছে আছে ঐতিহ্যবাহী আরও অনেক জায়গা, অবকাশ যাপনের বিভিন্ন আয়োজন যা আপনি আমি জানি না বলে তেমন পর্যটকমূখর হয়ে ওঠে নি এখনো।
 
জিন্দা পার্ক-
পার্কটি কোন সরকারি উদ্যাগের ফসল নয়। আবার কোন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নির্মাণও নয়। জেনে অবাক হবেন যে, পার্কটি তৈরি হয়েছে এলাকাবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং তাদের প্রাণান্ত চেষ্টার মাধ্যমে। এলাকার ৫০০০ সদস্য নিয়ে “অগ্রপথিক পল্লী সমিতি” ১৯৮০ সালে যাত্রা শুরু করে। ৩৩ বছর তাদের সম্মিলিত অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল এই পার্কটি।
 
পার্কটির অবস্থান নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে। ১৫০ এখর জায়গা জুড়ে এটি বিস্তৃত। ২৫০ প্রজাতির ১০ হাজারের বেশী গাছ-গাছালী আছে পার্কটিতে। গাছের এই সমারোহ এর পরিবেশকে করেছে শান্তিময় সবুজ, কলকাকলীতে মুখর করেছে অসংখ্য পাখীরা। শীতল আবেশ এনেছে ৫ টি সুবিশাল জলাধার। তাই গরম যতই হোক পার্কের পরিবেশ আপনাকে দেবে শান্তির ছোঁয়া।
 
কিভাবে যাবেন-
ঢাকা থেকে বাস যোগে কাঁচপুর ব্রীজ হয়ে ভূলতা গাওছিয়া হয়ে বাইপাস দিয়ে কাঞ্চন ব্রীজ হয়ে জিন্দা পার্কে আসা যায়। ঢাকা থেকে জিন্দা পার্কের দূরত্ব ৩৭ কিঃ মিঃ। অথবা ঢাকা হতে টঙ্গী মিরের বাজার হয়ে বাইপাস রাস্তা দিয়ে জিন্দা পার্ক আসা যায়, টঙ্গী হতে জিন্দা পার্কের দূরত্ব ২৮ কিঃ মিঃ।
 
মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি
বাড়িটি নির্মাণ করেন রামরতন ব্যানার্জী। তিনি নাটোর স্টেটের ট্রেজারার এবং মুড়াপাড়া রাজ পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। ১৮৮৯ সালে ১৬.৫০ একর জায়গা জুড়ে রাজবাড়িটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। রামরতন অবশ্য কাজ শেষ করে যেতে পারেন নি। তার পূত্র বিজয় ব্যানার্জী ১৮৯৯ সালে নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করেন প্রাসাদটির।
 
জমিদার বাড়ির বিশালতা মুগ্ধ করবে আপনাকে। এখানে আছে ৯০ টিরও বেশী কক্ষ। দোতলা বাড়ির সামনে বিশাল মাঠ, আছে সান বাধানো বিশাল পুকুর, আম বাগান। মন্দির, মঠ। বাগানে আছে সারি সারি দীর্ঘ পাম গাছ। প্রাসাদে আছে অতিথিশালা, কাচারি ঘর, নাচ ঘর, পূজা ঘর, আস্তাবলসহ অনেক কক্ষ। পিছন দিকে আছে উঠান, বাগান ও পুকুর।
 
১৯৪৭ এ দেশ বিভাগের পর জমিদারগণ এই বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় চলে যান। পরিত্যক্ত ভবনটিতে তৎকালীন সরকার শিশু অপরাধী সংশোধন কেন্দ্র স্থাপন করেন, পরবর্তীতে এটি অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়। ১৯৬৬ সালে মুড়াপাড়ার বিশিষ্ট শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী হাজী গোলবক্স ভূইয়া বাড়িটিতে ‘‘হাজী গোলবক্স ভূইয়া কলেজ’’ চালু করেন। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কলেজটির নাম পরিবর্তন করে মুড়াপাড়া ডিগ্রি কলেজ করা হয়। বর্তমানে এটি ‘‘মুড়াপাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ’’ নামে পরিচিত। ঐতিহাসিক বাড়িটি দেখে আসতে পারেন।
 
কিভাবে যাবেন-
ঢাকা থেকে বাস যোগে যাবেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে। সেখান থেকে সিএনজি, অটোরিকশায় যেতে পারবেন মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি।
 
কদম রসুল দরগাহ
এটিও নারায়ণগঞ্জে। দরগাটি নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর উপজেলার নবীগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর কোল ঘেঁষে অবস্হিত। ধারণা করা হয়, দরগায় রক্ষিত পাথরের ফলকের উপর দৃশ্যমান পদচিহ্নটি প্রকৃতপক্ষে হযরত মুহম্মদ (সা:) এর পদচিহ্ন। পাথরের ফলকটি আকারে প্রায় ২৪০০ বর্গ সে: মি: এবং অনেকটা মানুষের পায়ের পাতার আকৃতিতে কাটা। ইতিহাসবিদদের মতে মাসুম খান কাবুলী নামে একজন আফগান রাজা/সেনাপ্রধান সপ্তম শতাব্দীতে এই নিদর্শনটি একজন আরব সওদাগর-এর নিকট থেকে সংগ্রহ করেন। বর্তমানে যে মঠের ভেতরে কদম রসুল ফলকটি রক্ষিত সেটি ১৭৭৭-৭৮ খ্রিস্টাব্দে গোলাম নবী নামে ঢাকার একজন জমিদারের হাতে নির্মিত।
 
কদম রসুল এর ফলকটি মঠের কেন্দ্রে অত্যন্ত যত্নের সাথে সংরক্ষিত। হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রতিদিন বহু ধর্মপ্রাণ মুসলিম এই দরগায় আসেন। দরগার ভেতরে মঠ ছাড়াও একটি বিশাল মসজিদ রয়েছে। বিশেষ করে দরগার প্রবেশদ্বারের নির্মাণশৈলী সবার নজর কেড়ে নেয়।
 
কিভাবে যাবেন-
ঢাকার গুলিস্তান থেকে বাসযোগে নারায়ণগঞ্জ শহরের হাজীগঞ্জ গুদারাঘাট থেকে নৌকা পার হয়ে বন্দর উপজেলার নবীগঞ্জ গুদারাঘাটে নেমে পায়ে হেঁটে কদম রসুল দরগায় যাওয়া যায়। সড়ক পথে কাঁচপুর ব্রিজ পার হয়ে মদনপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে নবীগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড পৌঁছে পশ্চিম দিকে রিকশাযোগে কদম রসুল দরগায় যাওয়া যায়।
 
শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আশ্রম
মনোরম শান্তিময় আশ্রমটি হতে পারে আপনার একদিনের বেড়ানোর চমৎকার গন্তব্য। আশ্রমটির অবস্থান সোনারগাঁ উপজেলার বারদী বাজারে।
প্রতি বছর ঊনিশ জ্যৈষ্ঠ এখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের মহাপুরুষ লোকনাথ ব্রহ্মচারীর তিরোধান উৎসব ও সপ্তাহ ব্যাপী মেলা বসে। শ্রীশ্রীলোকনাথ ব্রম্মচারী মৃত্যবরণ করেন ১২৯৭ সালে। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই এই আশ্রম এবং এর যত আয়োজন। মেলার সময় মিলিয়ে ঘুরে আসতে পারেন এখানে।
এই তিরোধান উৎসবে অংশগ্রহণ করতে প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কাসহ দেশের লক্ষাধিক লোকনাথভক্ত বারদী আশ্রমে এসে সমবেত হন।
 
জ্যৈষ্ঠের ঊনিশ তারিখ আশ্রমের চৌচালা ছাদের উপর থেকে ভক্তদের ছুঁড়ে দেয়া বাতাসা, মিষ্টান্ন ও তা কুড়ানোর উচ্ছ্বল আয়োজন হয় যা “হরি লুট” নামে পরিচিত। এছাড়া দিন ব্যাপী চলে গীতা পাঠ, বাল্যভোগ, লোকনাথের জীবন বৃত্তান্ত পাঠ, রাজভোগ, প্রসাদ বিতরণ ও আরতী কীর্তনসহ ধর্মীয় নানা অনুষ্ঠান।
 
শ্রী শ্রী বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আশ্রমের দক্ষিণের উঠানে তাঁর সমাধিস্থলের পশ্চিমে শত বৎসর ধরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল আকৃতির একটি বকুল গাছ । আশ্রমের ভেতরে আছে লোকনাথ ব্রহ্মচারীর বিশাল তৈলচিত্র । মূল আশ্রমের পেছনে খোলা উঠান পেরিয়ে বিশাল পাঁচতলা ভবনের যাত্রীনিবাস (ভক্তগণের আবাসন)। পশ্চিমে আরও দুটি বিশালাকার যাত্রীনিবাস। ভক্ত ও দর্শণার্থীরা বিনা পয়সায় এখানে রাত্রিযাপন করেন।
 
সাধক পুরুষ লোকনাথ ব্রহ্মচারী জীবিত থাকা অবস্থায় আশ্রমের পাশে কামনা সাগর ও জিয়স নামে পুকুর খনন করা হয়। এই পুকুরটিতে আশ্রমে আগত ভক্তরা স্নান করেন। বারদীর লোকনাথ আশ্রম এখন শুধুমাত্র হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তীর্থ স্থানই নয়, বরং ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে সকল মানুষের কাছে এক মিলন মেলার স্থান হিসেবে পরিচিত।
 
কিভাবে যাবেন-
বাসযোগে যাবেন সোনারগাঁ। এরপর অটোরিকশা বা সিএনজিতে যেতে পারবেন আশ্রমে বারদী বাজারে।

You might like