ভাওয়াল রাজবাড়ী 08/05/2016



ভাওয়াল রাজবাড়ী, বলা হয়ে থাকে এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জমিদারবাড়ী। আগের সময়ের মতো জমিদারি নেই, কিন্তু সেই আমলের জমিদারবাড়ীতে এখনো মিশে আছে জমিদারি। বাড়ির আঙিনায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অতীতের গল্পকথা। ভাওয়ালের জমিদারি বিলুপ্ত হলেও রয়ে গেছে সেই জমিদারবাড়ীটি। গাজীপুরের প্রাণকেন্দ্র ভাওয়ালের সেই জমিদারের জমিদারি ঘুরে দেখতে গেলে পাবেন পুরনো স্মৃতির বেমিশাল স্বাদ।

সবুজ শ্যামল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লালমাটির লীলাভূমি আর রাজা গাজীদের ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত আজকের গাজীপুর জেলাই ছিল প্রাচীন ভাওয়াল নামে পরিচিত। ভাওয়াল রাজাদের ঐতিহাসিক রাজবাড়ী আজও বহু ঘটনার ও বহুকালের নীরব সাক্ষী। কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে তাদের ঐতিহ্য। একসময় এখানে রাজার পদচারণা এবং তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ছড়িয়ে ছিল গ্রামের পরতে পরতে। সময়ের স্রোতে কত কিছু বিলীন হয়ে গেছে, কিন্তু এখনো কোথাও কোথাও রয়ে গেছে ইতিহাস আর অতীতের চিহ্ন, যা দেখে ভালোলাগা বেড়ে যায়, বলে যায় অতীতের রাজ দরবারের গল্প কথা। ইচ্ছা হলে সময় করে এমনই এক স্থান গাজীপুরের ভাওয়াল রাজার রাজবাড়ী থেকে ঘুরে আসতে পারেন।

গাজীপুর জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে কালের সাক্ষী হয়ে প্রায় অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক ভাওয়াল রাজবাড়ী। আয়তন এবং কক্ষের হিসাবে এটি একটি বিশাল আকারের রাজবাড়ী। প্রায় ৫ একর জায়গার ওপর রাজবাড়ীটি নির্মিত। এ রাজবাড়ীর পশ্চিম পাশে রয়েছে বিশাল একটি দীঘি এবং সামনে রয়েছে বিশাল সমতল মাঠ। রাজবাড়ীটির পুরো এলাকাই সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। সীমানা প্রাচীরেও কারুকার্য খচিত, বেশ উঁচু। প্রধান ফটক থেকে প্রায় অর্ধবৃত্তাকারের দুটো পথের যে কোনো একটা ধরে অগ্রসর হলেই মূল রাজপ্রাসাদ।

জমিদারির ইতিহাস
পূর্ব বাংলার ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম জমিদারি। ভাওয়াল জমিদার বংশের পূর্বপুরুষরা মুন্সীগঞ্জের অন্তর্গত বজ্রযোগিনী গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন বলে জানা যায়। এ বংশের জনৈক বলরাম এবং তার পুত্র শ্রীকৃষ্ণ তত্কালীন বাংলার দেওয়ান মুর্শিদকুলী খানের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি কৌশলে গাজীদের বঞ্চিত করে জমিদারি হস্তগত করেন। ১৭০৪ সালে শ্রীকৃষ্ণ ভাওয়ালের জমিদার হন। তখন থেকে এ পরিবারটি ১৯৫১ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত জমিদার ছিলেন। শিকারি বেশে রমেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এর পরবর্তী সময়ে ভাওয়াল পরিবার বহু ছোটখাটো জমিদারি বা জমি ক্রয় করে একটি বিরাট জমিদারির গোড়াপত্তন করেন। ১৮৫১ সালে পরিবারটি নীলকর জেমস ওয়াইজের জমিদারি ক্রয় করেন। সরকারি ইতিহাস থেকে তথ্য মিলে যে, ভাওয়ালের জমিদার ৪ লাখ ৪৬ হাজার টাকা দিয়ে ওয়াইজের জমিদারি ক্রয় করেছিলেন, যা ছিল সে আমলের বড় একটি অঙ্ক। ১৮৭৮ সালে এ পরিবারের জমিদার কালীনারায়ণ রায় চৌধুরী ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে বংশানুক্রমিক ‘রাজা’ উপাধি লাভ করেন। ভাওয়াল এস্টেটের সর্বশেষ ক্ষমতাবান জমিদার ছিলেন রাজা রাজেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী। তিনি ১৯০১ সালে মৃত্যুবরণ করেন। এরপরই জমিদারিটি কোর্ট অব ওয়ার্ডসের অধীনে চলে যায়। বর্তমানে এটি ভাওয়াল এস্টেটের কর্মকাণ্ড গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ভূমি সংস্কার বোর্ডের অধীনে।

কীভাবে যাবেন
দেশের যে কোনো স্থান থেকে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা হয়ে শিববাড়ী মোড়। ঢাকা থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা হয়ে জমিদারবাড়ী যেতে হয়। রাজবাড়ীতে ভ্রমণের জন্য নিজের কিংবা ভাড়া করা গাড়ি নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন। গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে ডান দিকে রাস্তাটি গেছে জয়দেবপুর সদর বরাবর। জয়দেবপুর সদর রেল ক্রসিং পার হয়ে সামান্য সামনে এগিয়ে গেলেই রানী বিলাসমণি স্কুল। এ স্কুলের ঠিক বিপরীত পাশেই ভাওয়াল রাজবাড়ীটি অবস্থিত। আর রাজবাড়ী থেকে ১ কি.মি. উত্তরে এগিয়ে গেলে মিলবে রাজবাড়ী শ্মশান।

কোথায় থাকবেন
ঢাকা থেকে দিনে গিয়ে দিনেই শেষ করা সম্ভব গাজীপুর ভ্রমণ। তাই এখানে অবস্থান না করলেও চলে। তারপরেও শহরের বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ মানের কিছু হোটেল রয়েছে।

ভাওয়াল রাজবাড়ী
রাজবাড়ীর প্রবেশমুখে প্রশস্ত বারান্দা, এরপর একটি হলঘর। ওপরে ওঠার জন্য আগে শাল কাঠের প্রশস্ত সিঁড়ি ছিল, যা এখন নষ্ট হয়ে গেছে। নাটমন্দির রয়েছে বাড়ির মধ্যখানে। এটি লম্বালম্বি বড় টিনের ঘর। টিনের ঘরের ঠিক মাঝখানে মঞ্চটির অবস্থান। এখানে বাইজিদের নাচ-গানের আয়োজন করা হতো। আবার এ ঘরেই সব ধরনের অনুষ্ঠান হতো। জমিদার শিকারে গেলে যদি কাউকে মনে ধরত হাতি পাঠাতেন তাকে উঠিয়ে আনার জন্য। পশ্চিমের দোতলা ভবনে তার জন্য ঘর বরাদ্দ করতেন। রাজবিলাস নামের একটি কামরা ছিল, যা জমিদারের মনোরঞ্জনের জন্য বরাদ্দ থাকত। এ ছাড়া রাজার বিশ্রামাগার হাওয়ামহলও ছিল একই ভবনের নিচতলায়। দক্ষিণ দিকের খিলানযুক্ত উন্মুক্ত কক্ষটি হচ্ছে ’পদ্মনাভি’। মাঝের বড় ঘরটির নাম ‘রানীমহল’। ছোট-বড় সব মিলিয়ে প্রায় ৩৬০টি কক্ষের ইতিহাস এ জমিদারবাড়ীটির।

এ তো গেল জমিদারবাড়ীর ছোট্ট বৃত্তান্ত। ভাওয়ালের জমিদারবাড়ীর কথা এলে সেকালের শ্মশানের কথা তো ভোলার নয়। জমিদারবাড়ী থেকে মাত্র ১ কি. মি. উত্তরে চিলাই নদীর তীরে। এখানে পুরনো একটি শিব মন্দির আছে। একটি শিখর কাঠামোর সমাধি মন্দিরও আছে, ফুল-লতা-পাতায় অলঙ্কৃত এ ঐতিহাসিক রাজবাড়ীর শ্মশানটি। কম বয়সী আরও তিনটি সমাধি ও মন্দির রয়েছে এখানে। রাজবাড়ী আর শ্মশান ঘাটের মাঝখানে আছে শালবন। শালবন থেকে খানিক এগোলে ‘রাজা অধর চন্দ্র স্কুল ও কলেজ’ দেখা যায়।

ইতিহাসের কিছু কথা
জমিদার লোকনারায়ণ গোড়াপত্তনের জন্য জমিদারবাড়ীটির নির্মাণকাজ শুরু করেছিলেন, কিন্তু তিনি তা শেষ করতে পারেননি। তার এ অসমাপ্ত কাজ শেষ করেন রাজা কালীনারায়ণ রায়। ভাওয়াল রাজারা বেশি আলোচনায় আসেন পরিবারের মেজো সন্তান রমেন্দ্রনারায়ণ রায়ের কারণে। তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া কিছু অলৌকিকতা সে আমলের মানুষের মুখে মুখে ছিল। এর কারণ হলো, তিনি মারা যাওয়ার পর আবার ফিরে এসেছিলেন। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য দার্জিলিং গিয়েছিলেন। কিন্তু সে সময়ের গুজব ছিল তিনি মারা গেছেন। মূল ঘটনাটি ছিল একটু ভয়ানক। আসলে রানী বিভাবতী ও ডাক্তার আশুতোষ দাশগুপ্ত ষড়যন্ত্র করে তাকে বিষ প্রয়োগ করেছিলেন। ভাড়াটিয়া ডোম দিয়ে চিতায় পোড়ানোর ব্যবস্থাও করেন। কিন্তু প্রবল বৃষ্টিতে ডোমরা হত্যা করা লাশটি না পুড়িয়েই চলে যান। রমেন্দ্রনারায়ণ বেঁচে যান ঠিকই! কিন্তু তার স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। এভাবে কেটে যায় ৯টি বছর। পরবর্তীতে তিনি স্মৃতিশক্তি ফিরে পেয়ে ভাওয়ালে এসে উপস্থিত হন। তিনি জমিদারি দাবি করে মামলা ঠুকে দেন। ব্রিটিশ আমলে ঘটনাটি কলকাতায়ও খুব আলোচিত ছিল। 

 

সৌজন্যে : বাংলাদেশ প্রতিদিন