মায়া ছড়াচ্ছে 'মহামায়া' 02/05/2016



জল আর রোদের খেলা। এমন মিতালি ১১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের স্বচ্ছ লেকে। তার চারদিকে চোখ-জুড়ানো সবুজের সমারোহ। হাতছানি দিয়ে ডাকছে আঁকাবাঁকা পাহাড়ের সৌন্দর্য। এমন দৃশ্য রোমান্টিকভাবে উপভোগ করতে 'মহামায়া' লেকের বুকে জেগে থাকা পাহাড়ের চূড়ায় আধুনিক কটেজ তৈরি করেছে বন বিভাগ। শুধু তাই নয়, সে সঙ্গে লেকের আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে নৌকায় চড়ার স্বাদ নিতে লেকে ভাসানো হয়েছে রঙিন ডিঙি নৌকা। এমন মায়ার জাল ও প্রকৃতির প্রেমে বন্দির সুযোগ রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহামায়া প্রাকৃতিক লেকে। রাঙামাটির কাপ্তাই লেকের মতো এটিও মায়া ছড়াচ্ছে পর্যটকের মনে।



মিরসরাইয়ের উত্তরে মহামায়া লেকের জলরাশির প্রেমে পর্যটককে বন্দি করতে যখন এত আয়োজন, ঠিক তখনই মিরসরাইয়ের দক্ষিণে 'পাহাড়ের কান্না' দেখতে প্রতিদিনই ছুটছেন হাজারো পর্যটক। কেউ সেলফি তুলছেন, কেউ নেমে পড়ছেন খইয়াছড়ার দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক ঝর্ণা ও মনোমুগ্ধকর জলপ্রপাতে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে দুই কিলোমিটার দূরত্বের বারৈয়ারঢালা জাতীয় উদ্যানে একসঙ্গে আটটি ঝর্ণা ও জলপ্রপাত দেখতে পর্যটককে আনা-নেওয়া করতে আছে ১৫-২০ জনের গাইড দলও। মিরসরাইতে শুধু এ দুটি পর্যটন স্পটই নয়, ভ্রমণপিপাসুদের মন ভরাতে রূপে-গুণে-বৈচিত্র্যে ভরপুর হয়ে রূপ ছাড়াচ্ছে মুহুরী সেচ প্রকল্প ও অপরূপ বাওয়াছড়ার লেক পর্যটন কেন্দ্র। 

 


করেরহাট রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক হোছেইন আহম্মদ বলেন, 'মহামায়া লেকের রাতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পাহাড়ের চূড়ায় একতলা কটেজ তৈরি করা হয়েছে। চালুর অপেক্ষায় থাকা কটেজে দুটি বেডরুম, আলাদা কিচেন, ডাইনিং, ওয়াশরুমও রয়েছে। কটেজ চালু হলে পর্যটকের কাছে মহামায়ার জৌলুস অনেক বেড়ে যাবে।' মিরসরাই থানার ওসি ইমতিয়াজ ভূঁইয়া বলেন, 'মহামায়া লেকের নিরাপত্তা বাড়াতে সার্বক্ষণিক পুলিশ টহল ও ফাঁড়ি স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে।'

লেকে ঝুলবে কেবল কার ও পর্যবেক্ষণ টাওয়ার :২০১০ সালে ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম শহর থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরত্বে ১১ বর্গকিলোমিটার পাহাড়ি এলাকায় মহামায়া পর্যটন কেন্দ্রটি তৈরি 

করে সরকার। কৃত্রিম লেকটি পর্যটকের কাছে আকর্ষণীয় করতে কটেজ নির্মাণ করার পাশাপাশি এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ের মধ্যে কেবল কার, পাহাড়ে পাহাড়ে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার তৈরি শুরু করেছে বন বিভাগ। প্রতিদিনই চাপ বাড়তে থাকায় লেকের পাড়ে পর্যটকের বসার জন্য দৃষ্টিনন্দন ছাতার টেবিল, ইটের চেয়ার ও আড্ডা স্পট তৈরি করা হয়েছে। গড়ে উঠেছে উন্নত মানের খাবার হোটেল ও রেস্টুরেন্ট। রাজস্ব বাড়াতে দর্শনার্থীর কাছে প্রবেশ ফি ১০ টাকা, লেকে প্রতি ঘণ্টায় ইঞ্জিন বোর্ডে ঘুরতে ৩০০ টাকা, গাড়ি পার্কিং সিএনজি ১০ টাকা, কার-মাইক্রো ২০ টাকা হারে অর্থ আদায় করছে বন বিভাগের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

খইয়াছড়ার আট ঝর্ণা ও জলপ্রপাত মন ভরিয়ে দেয় পর্যটকের :বড়তাকিয়া বাজার থেকে দুই কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেই খইয়াছড়ার আটটি প্রাকৃতিক ঝর্ণা ও জলপ্রপাত মন ভরিয়ে দেয় পর্যটকের। ২০১০ সালে খোঁজ মেলে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা মায়াবী প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর ঝর্ণা ও জলপ্রপাত। পাহাড়ের ছড়া ও সরু মাটির রাস্তা পেছনে ফেলেই ভূঁইয়া টিয়ায় পেঁৗছালে দেখা মেলে সর্ববৃহৎ প্রথম ঝর্ণা ও জলপ্রপাতটির। আরেকটি উঁচু পাহাড় এগিয়ে গেলেই ধাপে ধাপে দেখা যায় অন্য সাতটি ঝর্ণা ও জলপ্রপাত। এখানে পর্যটককে নিয়ে যাওয়ার জন্য আছে গাইডলিডার নাজিম উদ্দিনের নেতৃত্বে শাহরিয়ার হোসেন, তারেক, সোহেল, হাসান প্রমুখ। এদের ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পারিশ্রমিক দিতে হয়। খইয়াছড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বলেন, 'খইয়াছড়া ঝর্ণাটি মাধবকু ও শুভলং ঝর্ণার থেকেও বেশি সুন্দর। কারণ, এখানে ধাপে ধাপে আটটি ঝর্ণা ও জলপ্রপাত রয়েছে। একসঙ্গে ঝর্ণা ও জলপ্রপাত বাংলাদেশের আর কোথাও নেই।'

জল আর রোদের খেলা মুহুরীর চরে :প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় মুহুরী সেচ প্রকল্পে। যেখানে আছে আলো-আঁধারির খেলা, প্রান্তিক মানুষের জীবন-জীবিকার নানা চিত্র। চরে ছোট ছোট সেচ প্রকল্পের এপারে মিরসরাই, ওপারে ফেনীর সোনাগাজী। এখানে ৪০ দরজার রেগুলেটরের শোঁ শোঁ আওয়াজ শোনা যায় দূর থেকেও। পশ্চিমে মৎস্য আহরণের খেলা আর পূর্বে মন-কাড়ানিয়া প্রকৃতি। ডিঙি নৌকায় ভর করে কিছুদূর যেতেই দেখা মিলবে সাদা বকের পাল। দেখা যায় অতিথি পাখির মেলাও। আর চিকচিকে বালুতে জল আর রোদের খেলা চলে সারাক্ষণ। সামনে-পেছনে, ডানে-বাঁয়ে কেবল সৌন্দর্য আর সুন্দরের হাতছানি। জোরারগঞ্জ বাজার থেকে সড়কপথে যাওয়া যায় মুহুরী সেচ প্রকল্পে। অন্যদিকে, উপজেলার ওয়াহেদপুরের বাওয়াছড়া পাহাড়ি এলাকায় যুগ যুগ ধরে ঝর্ণা প্রবাহিত হচ্ছে। সবুজ-শ্যামল পাহাড়িয়া লেকে পাখিদের কলতানে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। এখানেও রয়েছে বিশাল পাহাড়ি অপরূপ লেক বাওয়াছড়া। এ লেক দেখতে প্রতিদিনই যান পর্যটকরা।