বর্ষায় অপরূপ বগালেক 23/04/2016



মেঘের পেখম থেকে ঝরে পড়ে বৃষ্টি। বগালেকের স্বচ্ছ জলে সবুজের ছায়া, ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে ভরে উঠছে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ২শ’ ফুট উপরের এই প্রাকৃতিক লেক। জনশ্রুতি আছে প্রাচীন কোনো আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ থেকে এই লেকের সৃষ্টি।

 

বর্ষায় বগালেক মেলে ধরে তার আসল সৌর্ন্দয্য।

চট্টগ্রাম থেকে এরকম ঝড়োবৃষ্টি মাথায় নিয়ে রওনা হই বগালেকের উদ্দেশ্যে। সকালের বাস দুই ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছায় পাহাড়িশহর বান্দরবানে।

সকালের নাস্তা সেরেই আবার যাত্রা শুরু রুমা স্টেশনের দিকে। সেখানে পৌঁছতেই বৃষ্টি প্রথমবারের মতো ভিজিয়ে দিল সবাইকে। রুমা’র বাস ছাড়বে সকাল ১০টায়। অপেক্ষার সময়টা বয়ে গেল চোখের পলকে। একসময় ঝড়ের গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে আমাদের বাস।

বান্দরবান থেকে রুমা পযর্ন্ত পুরো পথটায় পাহাড়ে মোড়ানো। উঁচু পাহাড়ের পথ ধরে বৃষ্টির মধ্যে এগিয়ে যাচ্ছে বাস। বৃষ্টিকে ষোলআনা উপভোগ করতে বাসের ছাদই শ্রেষ্ঠ। তবে বৃষ্টিতে বাসের ছাদ থেকে ঝাপসা দূরের জগত। কারণ সবুজ পাহাড়গুলো ততক্ষণে নিজেকে ঢেকেছে বৃষ্টির চাদরে।

পাহাড়গুলো স্পষ্ট দেখা যায় না। বৃষ্টিতে আমাদের প্রায় জবুথবু অবস্থা। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে কখনও নিচু গাছের মৃদু আঘাত! বৃষ্টির বৈতরণি পারি দিয়ে কিছুটা সময়ের জন্য বিরতি। ভেজাদিনে গরম চা খুবই আনন্দদায়ক! ওয়াই জংশন মুরং দোকানে গরম চায়ে চুমক দিতে দিতেই বাস ছাড়ার সময় হয়ে গেল।

বৃষ্টিস্নাত সবুজের পথ পেরিয়ে বাস চলেছে রুমা’র পথে। হালকা বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আড্ডা হয় এক মুরং বন্ধুর সঙ্গে। দুপুরের নাগাদ পৌঁছায় রুমা স্টেশন। সেখানে নেমেই চোখে পড়ে স্রোতস্বিনী সাঙ্গু নদী। উজানে বয়ে আসা বৃষ্টির পানি- পাহাড়ি ঢল !

তাই রুমাবাজার যেতে হবে নৌকায়। তীব্র গতির স্রোত ঠেলে ইঞ্জিনচালিত দেশি নৌকা রুমাবাজারের দিকে যাত্রা শুরু করল। দলে যারা সাঁতার জানত না, তারা একটু ভয় পেয়েই গেল! তবে পথটা বেশিক্ষণের নয়, জলের পথ শেষ হতেই তাদের চোখে মুখে ভূবন জয়ের হাসি!

রুমাবাজারে অভ্যার্থনা জানালেন রুমার গাইড শাহজাহান। দুপুরের খাওয়া শেষ করেই বগালেকের পথে যাত্রা। ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ– তাই রুমা থেকে বগালেক পযর্ন্ত পায়ে হেঁটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। রুমাবাজার আর্মি ক্যাম্পে পরিচয় লিপিবদ্ধ করেই রওনা যাত্রা শুরু।

রুমা থেকে বগালেকের পায়ে হাঁটা পথের দূরত্ব প্রায় ১৭ কিলোমিটার। বৃষ্টির কারণে পথ বেশ পিচ্ছিল। কাঁধে ব্যাকপ্যাক, হাতে ট্র্যাকিং স্টিক নিয়ে হেঁটে চলেছে নয়জনের দল। উপরে থাকাতে মনে হল যেন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামবে! ভাবতে না ভাবতেই চোখের সামনে দেখছি দূরের পাহাড়গুলো কেমন করে বৃষ্টিতে ঢেকে যাচ্ছে। কানে আসছিল বৃষ্টির শোঁ শোঁ শব্দ, বৃষ্টি ক্রমাগত এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে।

একসময় বৃষ্টি আমাদেরকেও ছুঁয়ে ফেলল। তখন প্রায় বিকেল। সন্ধ্যার আগেই বগালেক পৌঁছাতে হবে। তাই বৃষ্টির মধ্যেই হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেওয়া হল। ঝুপঝুপ বৃষ্টিতে পিচ্ছিল রাস্তা মাড়িয়ে হাঁটতে হচ্ছে।

বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা। যাত্রাপথে হালকা বিরতি। এর মধ্যে বৃষ্টি কিছুটা কমে এসেছে। মেঘহীন আকাশ, বেশ ঝকঝকে। তবে ঘনিয়ে আসছে সন্ধ্যা। মেঘমুক্ত আকাশের হঠাৎ চাঁদের উঁকিঝুঁকি। সেই আলোতে হাঁটতে হাঁটতে বগালেকের পথে।

বৃষ্টির গন্ধ, পাহাড়ি পথে জোছনার স্নান সবমিলিয়ে অদ্ভুত শিহরণ! একধরনের থ্রিলিং নিয়ে কৃত্রিম আলোর সাহায্য ছাড়াই শেষমেষ পৌঁছলাম বগালেক। লেকের ঠাণ্ডা জলে মুখ ভিজিয়ে সিয়াম দি’র কটেজে জলপান। এখানেই আমাদের রাতযাপন। কটেজে নিজেদের ব্যাকপ্যাক রেখেই লেকের জলে লম্বা গোসলের প্রস্তুতি! ঝাঁকে ঝাঁকে তারার দল বগালেকের আকাশে।

ক্লান্ত অভিযাত্রীর দল নিজেদের ভিজিয়ে নিল বগালেকের শান্ত শীতল জলে। চারপাশের দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন পাহাড়ের সারি। বাতাসের শব্দ বয়ে আসছে কাছের পাহাড় থেকে।

রাতের বগালেক যেন এক মায়াবী রাজ্য। পাহাড়ের ঝিঝিপোকার শব্দ, কাছে-দূরের মেঘ, সবুজ বন আর বারোশ ফুট উপরে বিশাল জলের আঁধার সব মিলিয়ে যেন অন্য এক পৃথিবী। এত উঁচু পাহাড়ের বুকে এই প্রাকৃতিক লেক না দেখলে যেন মনে হয় এক জীবন বৃথা !

রাতের খাবারে ভাতের সঙ্গে ঝাল ব্যাঞ্জন, অতুলনীয় স্বাদের রসনা তৃপ্ত মন।

ঝিরিঝিরি ঠাণ্ডা বাতাসে চাঁদের আলোয় জমে ওঠে আমাদের রাতে আড্ডা। সহস্র নক্ষত্রে ঢাকা বগালেকের রাতের আকাশ। সবুজ পাহাড়ে আটকে আছে বিশাল চাঁদ। জোছনায় নরম আলোয় ডুবে যাই ঘুমের দেশে।

ভোরে ঘুম জড়নো চোখ মেলে তাকাতেই দেখি চাঁদের পাহাড়গুলো ঢেকে আছে তুলোট মেঘের সারিতে। কটেজের দোতলা কাঠের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছি। মনে হচ্ছে মেঘের জনপদে আমি এর আদিম বাসিন্দা। এমন অনুভূতি কেবল বগালেকই দিতে পারে!

যেভাবে যাবেন

প্রথমে যেতে হবে বান্দরবান। সেখান থেকে প্রতি ঘণ্টায় রুমার বাস ছাড়ে। যেতে হবে রুমাবাজার। রুমা থেকে গাইড নিয়ে চাঁদের গাড়িতে অথবা পায়ে হেঁটে বগালেক যাওয়া যায়। রাতে থাকার জন্য কটেজ আছে।

প্রয়োজনীয় তথ্য

লেকের পানি খুবই স্বচ্ছ নীলাভ। পানিতে কোনো বোতল, প্যাকেট, প্ল্যাস্টিক ইত্যাদি ফেলবেন না। প্রকৃতিকে সুন্দর রাখবেন। 

লেখক : সমীর মল্লিক

You might like