পেঁচার দ্বীপ “মারমেইড ইকো রিসোর্টে” কিছু সময় 02/04/2016



ইট পাথরের শহরে যখন প্রান হাপিয়ে ওঠে,নিঃশ্বাসে ভেসে বেরায় ক্লান্তির ছায়া তখন,বিষন্ন মন তখন যেন দূরে কোথাও হারিয়ে যেতে চায়। কিন্তু ব্যাস্ততা যেন পিছু ছাড়তে চায়না। এই ব্যস্ততার ভীরেই একটু সময় করে একটা নির্ভেজাল আনন্দ নিতে ঘুরে আসতে পারেন  কক্সবাজারের মারমেইড ইকো রিসোর্ট থেকে। এখানে আপনি পেতে পারেন প্রকৃতি ঘেরা নির্মল আনন্দের বাতাস। কক্সবাজার গেলে এখানে কাটিয়ে আসতে পারেন কিছু সময়।

স্বপ্নিল সৌন্দর্যের এক আবাসভূমি কক্সবাজার এয়ারপোর্ট থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে রেযুখাল নদী। সেই নদীর তীরে জেলেদের এক ছোট্ট গ্রাম প্যাঁচার দ্বীপ। সে গ্রামের প্রায় সবাই মাছ শিকার করে জীবন চালায়।যেখানে একবেলা ভাত খাওয়ার সুযোগ পেত না তারা, সেখানে খেয়ে-পড়ে বাঁচতে পারছে এখন সেই জায়গায় কাজ জোটে প্যাঁচার দ্বীপ গ্রামের দরিদ্র-বেকার মানুষের, কারণ এখানেই রয়েছে “মারমেইড ইকো রিসোর্ট” । বদল নান্দনিক এ মারমেইড রিসোর্টটি ইকো-ট্যুরিজমের এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। বাংলাদেশের ব্যক্তিগত খাতে নির্মিত ইকো রিসোর্টের মধ্যে অন্যতম নাম মারমেইড রিসোর্ট।

মূলত ইকো ট্যুরিজমের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রকৃতির কোনোরূপ সম্পদের বিনষ্ট না করে পরিবেশবান্ধবভাবে উপভোগ্য কোনো জায়গা তৈরি করা। এ বিষয়টিকে মাথায় রেখেই মারমেইড ইকো রিসোর্টটি যে নির্মাণ করা হয়েছে তা একবার ঘুরে এলেই অনুধাবন করা যায়। এ রিসোর্টটি তৈরি করার সময় পরিবেশের ভারসাম্যের প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি রাখা হয়েছিল। থাকার ঘরগুলোর ছাদ-চালা বাঁশ ও ছন দিয়ে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেন তা গাছপালাগুলোর উচ্চতাকে ছাড়িয়ে না যায়। আশপাশের নৈসর্গিক দৃশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সব জায়গায় মাটি এবং কাঠ রঙের ব্যবহার করা হয়েছে।

অযত্নে বেড়ে ওঠা বুনো লতাগুল্মগুলোও যেন এই রিসোর্টের ভালোবাসার ধন। সেগুলো যেন স্বাভাবিক নিয়মে বেড়ে উঠতে পারে তা নিয়েও ভাবা হয় অনেক। বাংলোর জানালা ও দরজারগুলো বড় বড় যেন আগত অতিথিরা সুনির্মল বাতাস অথবা বৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পুরোপুরি উপভোগ করতে পারে। রাতে চোখ ধাঁধানো নিয়ন আলোর পরিবর্তে তাই খয়েরি ঠোঙার ভেতর মোমের আলো জ্বালিয়ে রাখা হয়।

রাস্তার ওপর থেকে তাকালে গাছপালার আড়ালে চোখে পড়ে ছোট-বড় অনেক কুটির। বড় রাস্তার ঢাল বেয়ে নিচে নামতেই কানে আসে কলরব। দুই পাশের জলাধারে ঝিকমিক করে ভরদুপুরের রোদ্দুর। গোটা তিরিশেক ভিলা আর বাংলোর নামেরও একই হাল।

কিন্তু ঘরগুলো সত্যিই মন ভালো করে দেওয়ার মতো। বাইরে স্রেফ কুটিরের মতো দেখালেও ভেতরে মোটামুটি আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা মজুদ। স্নানঘরটায় ঢুকলে মুহূর্তেই মন ভালো হয়ে যায়। প্লাস্টিকের বোতলে ভর্তি বাজারি শ্যাম্পুর বদলে কাচের পাত্রে ভেষজ উপায়ে বানানো শ্যাম্পু। সেটা আবার সবুজ গাছের পাতা দিয়ে কায়দা করে ঢাকা। দুই পাশে দুটো কাঠগোলাপ ফুল গুঁজে দেওয়া। সাবান, শ্যাম্পু রাখা হয়েছে নারকেলের লম্বা একটা খোলের মধ্যে।

মারমেইড ইকো রিসোর্টে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এমন সব জিনিসপত্র যথাসম্ভব কম ব্যবহার করা হয়েছে। পেঁচার দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশ বহাল রেখেই সব বাংলো তৈরি করা হয়েছে। ইয়োগা সেন্টার, স্পা, নৌকা ভ্রমণ, সম্মেলন কক্ষ, প্রেক্ষাগৃহ সব কিছুরই এখন ব্যবস্থা আছে এই পরিবেশবান্ধব অবকাশ যাপন কেন্দ্রে। মারমেইড রিসোর্টের মূল নকশা করেছেন স্থপতি জিয়াউদ্দিন খান।

নাগরিক কোলাহল নেই। হাঁকডাক নেই। দুপুরের রোদ মরে এলে কুটিরের সামনের বাঁশের বেঞ্চে গা এলিয়ে দিয়ে বসতে ভারি আরাম। এ সময়টা নৌকা ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ার জন্যও অতি উত্তম। বাংলোর সারি আর নারকেল গাছ পেরিয়ে হেঁটে গেলে রেজু খালের পাড়। দেখবেন, নীলচে রং ধরতে শুরু করেছে সবে সাগরের শাখা রেজু খালের পানিতে। পাশ দিয়ে

ভেসে যাবে বাহারি সাম্পান। দূরে আদিগন্ত বিছিয়ে থাকা সমুদ্র। নৌকা থামবে ওপারের কোনো এক অজানা চরে। বালুকাবেলায় পা রাখতেই হুটোপুটি করে ছুটে পালাবে লাল কাঁকড়ার দল। দখিনা বাতাসের দোলায় মাথা নেড়ে যেন অভিবাদন জানাবে ঝাউবন। তারপর ইচ্ছেমতো নির্জন সাগরতীরে ছুটোছুটি। কোন ফাঁকে বেলা পেরিয়ে যাবে! ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলেও ক্ষতি নেই।

যত তাড়াই থাকুক, বোট ক্লাবের পাটাতনে পেতে রাখা ঢাউস কেদারায় একবার বসে যেতে ভুলবেন না যেন। আকাশে পূর্ণচন্দ্র। সামনে সাগরের জল। আশ্চর্য মৌনতায় ডুবে আছে সমস্ত চরাচর। মন চাইলে গা এলিয়ে বসে থাকুন গভীর রাত অবধি। একদম কাকপক্ষীটিও জ্বালাতন করতে আসবে না আপনাকে।

রিসোর্টটির পাশেই স্থানীয় মন্দির, মাছের বাজার এবং অন্যান্য দেশীয় কৃষ্টির নিদর্শন পাওয়া যায়। নেই জমকালো ভাব, আছে নিরিবিলি পরিবেশ ও নিরাপত্তা। আছে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত বাছাইকৃত কর্মী, যাদের আন্তরিক ব্যবহার মুগ্ধ করবে সবাইকে।

যেভাবে যেতে হবে

কক্সবাজারের কলাতলী থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চেপে যেতে পারেন পেঁচার দ্বীপে।  মারমেইড ইকো রিসোর্টে বাংলো আছে নানা রকম। বাংলো বুকিংয়ের ব্যবস্থা করে ফেলতে হবে যাওয়ার আগেই। এখানে গেলে পাশাপাশি আরও বেশ কিছু স্থান দেখে নিতে পারবেন।

খরচ-

ভাড়া ২০০ টাকার মতো। এ রিসোর্টে কটেজ আছে ৩০টি। এখানকার কটেজে বিভিন্ন ক্যাটাগরির রুম রয়েছে। প্রথম ক্যাটাগরির কটেজের রুম ভাড়া ২ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকা আর দ্বিতীয় ক্যাটাগরিতে ৮ হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকা। থ্রি স্টার হোটেলের যাবতীয় সুবিধা আছে এ রিসোর্টটিতে। এখানে দুপুর ও রাতের খাবার সি ফুড, ইউরোপীয়, ক্যারিবীয় ও দেশি ডিশ পাবেন।

নিকটবর্তী দর্শনীয় স্থান

হিমছড়ি

ইনানী বীচ
ডুলাহাজরা সাফারী পার্ক।

You might like