শ্রীমঙ্গল ভ্রমণে একদিন 27/03/2016



চা এর শহর, তাজা কচি সবুজের শহর শ্রীমঙ্গল। এখানে ছোট ছোট পাহাড়, পাহাড়ে চা বাগান, লেক, হাওর, ঝর্ণা কি নেই? সবচেয়ে বড় যেটা আছে, সেটা হল শান্তি। শহুরে, ব্যস্ত ধুলাবালি ভরা জীবন থেকে বেরিয়ে ছোট্ট একটা ট্যুরে ঘুরে আসতে পারেন এখানে।

শ্রীমঙ্গলে আমাদের ভ্রমণ একেবারেই আকস্মিক। অফিস, চাকরি, টাকা পয়সা, ঘরসংসারের নিত্য কাজ সব মিলিয়ে ভ্রমণে সঙ্গী পাওয়া কঠিন। দুইজন বন্ধু মিলেই বেরিয়ে পড়লাম। বৃহস্পতিবার অফিস শেষে রওণা দিয়ে পরদিন ঘোরাঘুরি করে আবার বাসে চড়ে শনিবার অফিস। খুবই সংক্ষিপ্ত কিন্তু স্মরণীয় একটি ভ্রমণ ছিল এটি।

প্রথমে আমরা গেলাম মাধবপুর লেক। পাহাড়ে ঘেরা একটি লেক। লেকের পানিতে ফুটে আছে অসংখ্য নীল পদ্ম। চারিদিকের সবুজের ছায়া পড়েছে লেকের পানিতে। এখন বসন্ত। শীতের পুরনো জীর্ণ শুকনো পাতা ঝরে গাছে গাছে গজিয়েছে নতুন পাতা। প্রকৃতির এই বসন পরিবর্তনের সৌন্দর্য্য প্রতিফলিত হচ্ছে মাধবপুর লেকে। পাহাড়ের গায়ে চা বাগানও আছে। পাহাড়ের উপর থেকে লেকটি দেখতে আরও চমৎকার লাগে। নৌকায় লেকে বেড়ানোর ব্যবস্থা আছে। আমরা ঘন্টা দেড়েক ছিলাম এখানে। তবে মাধবপুর লেকের সমস্ত সৌন্দর্য্য নিতে হলে সারাদিনও মনে হয় যেন যথেষ্ট নয়। মাধবপুর লেক থেকে আমরা গেলাম লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। উদ্যানে সবুজ শান্ত প্রকৃতি সত্যিই মনোমুগ্ধকর। আমরা শুক্রবারে গেছি, তাই বেশ ভীড় ছিল। কিন্তু এই ভীড় শুধু বনের প্রবেশ মুখে। এরপর বনের ভেতর চলে গেছে কত সরু পথ, সেই পথ বেয়ে আপনি চলে যেতে পারবেন প্রকৃতির নিরব শান্ত গভীরে। ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গলের রেল পথটি এই বনের ভেতর দিয়েই গেছে। হিসেব মতে, বনে আছে  ২৬০ বা তারও অধিক প্রজাতির পাখিসহ বিভিন্ন প্রজাতির সরিসৃপ ও স্তন্যপায়ী প্রাণী। হরিণ, বন মোরগ, কাঠবিড়ালি, অজগর, গিবন (দীর্ঘদেহী বানর), চশমা বানর, হুনুমানসহ আরো অনেক প্রাণীও আছে। বনের মাঝে ঘন গাছপালায় আচ্ছাদিত কিছু জায়গা আছে, জনশ্রুতি মতে সেই জায়গায় নাকি বাঘও থাকে।

লাউয়াছড়া থেকে ফেরার পথে চোখে পড়ল লেমন গার্ডেন রিসোর্ট। ছোট ছোট টিলায় লেবু বাগান। তার মাঝে নিরিবিলি শান্তির ছায়ামাখা রিসোর্টটি। ছোট ছোট রঙ্গীন ঘর, তাকে ঘিরে সবুজের বিলাস। ভ্রমণে এই রিসোর্টে ঘুরে বেড়ানো ছিল একটি পাওয়া। এরপর বি টি আর আই। বাংলাদেশ চা গবেষণা ইন্সটিটিউট। এখানে যে দিকে চোখ যায় চা বাগান আর চা বাগান। কারখানায় দেখতে পারবেন কিভাবে চা তৈরি হয়। বিভিন্ন রকমের চা যেমন দেখতে পারবেন তেমন কিনেও আনতে পারবেন। তবে চা বাগানগুলো পাহাড়ে নয়, সমতলে। নতুন পাতার কচি রং সবসময়ই আমাকে মুগ্ধ করে। আর এখানে তো কচি সবুজের চাদর বিছানো চারিদিকে! অপূর্ব চোখ জুড়ানো সেই সবুজ। তার ফাকে ফাকে কাজ করছে চা শ্রমিকেরা। 

সাত লেয়ারের চা কিন্তু এখন ৮ লেয়ারে উঠেছে। স্বাদের কথা আর নাই বলি। তবে একটা কাপে ৮ টি ভিন্ন রং এর লেয়ার কিন্তু আসলেই বিস্ময়কর। নীলকন্ঠ চা কেবিন থেকে এই চায়ের সাথে সেলফি তুলে আমরা গেলাম মনিপুরী পল্লী। একটু কেনাকাটা না করলে কি আর হয়? ফেরার পথে শ্রীমঙ্গলের বদ্ধভুমিতে ঢুকেছিলাম কিছুক্ষণের জন্য। বদ্ধভূমিটি দুঃখজনকভাবে একটি পার্কে পরিণত হয়েছে। ইতিহাসের চর্চায় বাঙ্গালি বরাবরই দূর্বল।

আমাদের এক দিনের বেড়াবেড়ি ছিল এই পর্যন্ত। তবে সময় নিয়ে গেলে আরও দেখে আসতে পারবেন মাধবকুন্ড ঝর্ণা, হাকালুকি হাওর, হাইল হাওর, বাইক্কা বিলসহ আরও অন্যান্য দর্শনীয় জায়গাগুলি।

যাতায়াত-

বাস: সায়েদাবাদ থেকে শ্যামলী, হানিফসহ অনেক বাসই শ্রীমঙ্গল যায়। মহাখালি থেকে যা এনা। এমনি সময়ে গেলে আগে টিকেট না কাটলেও চলবে। প্রতি ৩০ মিনিটে একটি করে বাস ছেড়ে যায়, তাই টিকেট নিয়ে কোন সমস্যা নেই। 
ট্রেন: বাসের বদলে ট্রেনেও যেতে পারেন। লাউয়াছরার ভেতর দিয়ে শ্রীমঙ্গলে প্রবেশ করতেই মন আনন্দে ভরে উঠবে আপনার। পারাবত এক্সপ্রেস সকাল সাড়ে ৬ টায়, জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস দুপুর ২টায় এবং উপবন রাত সাড়ে ১০টায় । ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গলে চেয়ার কোচের ভাড়া ১৩৫ টাকা, ১ম শ্রেণীর চেয়ার ২০০ টাকা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোচে ৩০০ টাকা এবং স্লিপিং কোচে ৩৬০টাকা। টিকিট সংগ্রহ করা যাবে কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে।

আবাসন-

কোলাহল মুক্ত পরিবেশে থাকতে চাইলে উঠতে পারেন চা বাগানের ভিতর বিটিআরআই রেস্ট হাউজ অথবা টি রিসোর্ট-এ। লেমন ভিউ রিসোর্টের কথা তো বললাম। এখানে সিঙ্গেল, কাপল, গ্রুপ সব ধরণের রুম পাবেন। ভাড়া ৫০০০-১২,০০০ টাকা। এ ছাড়া শ্রীমঙ্গল শহর ও শহরতলীতে গড়ে উঠেছে অনেকগুলো রেস্ট হাউজ ও আবাসিক হোটেল। আমরা ছিলাম গ্রীন ভিউ গেস্ট হাউজে। 

অন্যান্য-

১ দিন বেড়াতে সি. এন. জি নিলে ১২০০-১৫০০ টাকা নেবে। আমরা ১৫০০ টাকায় এই জায়গাগুলো ঘুরেছি। এছাড়া লাউয়াছড়ায় ঢোকার টিকেট ২০ টাকা করে, গাড়ি পার্কিং এর একটা চার্জ আছে। গাইড নিলে ৩০০ টাকা রেট। তবে বনের গভীরে না গেলে গাইড না নিলেও হবে।

 

You might like