পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালি 21/03/2016



মহেশখালি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের একটি দ্বীপ এবং স্বতন্ত্র উপজেলা; যা মহেশখালী দ্বীপ নামেও পরিচিত। অধ্যাপক ড. সুনীতি ভূষণ কানুনগোর মতে ১৫৫৯খ্রিস্টাব্দের প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে মূল ভূ-খন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই দ্বীপের সৃষ্টি হয়। একজন পর্তুগীজ ভ্রমণকারী আরাকান অঞ্চলে এই প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের বিবরণ লিপিবদ্ধ করে গেছেন। তাছাড়া দ্বীপের পূর্ব প্রান্ত দিয়ে উত্তর দক্ষিণমুখী পাহাড় এবং তার পাদদেশে প্রবাহিত চ্যানেল থাকার কারণে অনুমিত হয় যে, দ্বীপটি একসময় মূল ভূ-খন্ডের সাথে যুক্ত ছিলো। মহেশখালী উপজেলা আরো তিনটি ছোট ছোট দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত। এগুলো হলো: সোনাদিয়া , মাতারবাড়ী ও ধলঘাটা। পান, মাছ, শুঁটকী, চিংড়ি, লবণ এবং মুক্তার উৎপাদন এই উপজেলাটিকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি।

নামকরনে ছোট্ট ইতিহাসঃ দ্বীপটির নামকরণের ইতিহাস সুবিদিত নয়। কিংবদন্তী অনুসারে, ছোট মহেশখালীর তৎকালীন এক প্রভাবশালী বাসিন্দা নুর মোহাম্মদ সিকদার, মাঝে মাঝেই পাহাড়ে হরিণ শিকার করতে যেতেন। একদিন হরিণ শিকার করতে গিয়ে সারাদিন এদিক-ওদিক ঘুরেও শিকারের সন্ধান না পেয়ে একটি গাছের নিচে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। হঠাৎ কিছু একটার শব্দে তার তন্দ্রা টুটে যায়। শব্দ অনুসরণ করে তিনি দেখতে পান যে, র সেই সুন্দর শিলাখন্ডটি নিয়ে তিনি বাড়ি ফেরেন। সেদিন রাতেই তিনি স্বপ্নে দেখতে পান: একটি গাভী একটি মসৃণ শিলাখন্ডের উপর বাট থেকে দুধ ঢালছে; এই গাভীটি তারই গোয়ালঘর থেকে কিছুদিন আগে হারিয়ে যায়। গাভী এক মহাপুরুষ তাঁকে বলছেন যে, শিলাখন্ডটি একটি দেব বিগ্রহ। এ বিগ্রহ যেখান থেকে নিয়ে এসেছেন সেখানে রেখে তার উপর একটি মন্দির নির্মাণ করতে হবে। মন্দিরের নাম হবে আদিনাথ মন্দির। এ আদিনাথের (শিবের ১০৮) নামের মধ্যে “মহেশ” অন্যতম। আর এই মহেশ নাম হতেই এই স্থান পরবর্তীতে মহেশখালী হয়ে যায়।

একটু বিবরণ: মহেশখালী দ্বীপের আয়তন ৩৬২.১৮ বর্গ কিলোমিটার, এবং এটি বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়িয়া দ্বীপ। কক্সবাজার থেকে দ্বীপটির দূরত্ব ১২ কিলোমিটার। উপজেলার উত্তর-পূর্বে চকরিয়া উপজেলা, দক্ষিণ-পূর্বে কক্সবাজার সদর, দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর, উত্তর-পশ্চিমে কুতুবদিয়া উপজেলা। উপজেলার উত্তর-দক্ষিন্মুখি মহেশখালী চ্যানেল দ্বারা মূল ভূ-খন্ড থেকে আলাদা হয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়েছে। ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ডিসেম্বর মহেশখালী থানা উপজেলায় পরিবর্তিত হয়।

যা কিছু দেখতে পাবেনঃ মহেশখালীতে দর্শনীয় জায়গাগুলোর মধ্য অন্যতম রুপে রয়েছে আদিনাথ মন্দীর । মহেশখালীর মৈনাক পর্বতের উপরে অবস্থিত আদিনাথ মন্দীর ।মহাদেব শীবকে নিবেদন করে এই মন্দীর নির্মিত। মন্দীরটির কারুকার্য বিশেষ করে প্রবেশ পথটি সত্যি চোঁখ জুরানো। প্রতিবছর ফাল্গুন মাসে আদিনাথ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এখানে ১৩ দিন ব্যাপি মনাক পর্বতের পাদদেশে অনুষ্ঠিত এ মেলায় অনেক দর্শনার্থী এবং সনাতন ধর্মাবলী শীব ভক্তকুলের পদচারনায় ভরপুর।

মূল ভূ খন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও এখানে এক সময় হাতি,বাঘ,হরিণ, বানর,ভালুক, বিভিন্ন প্রকারের জীবজন্তুর চারণভূমি ছিল মহেশখালী। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি আর নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংস আর এক শ্রেণীর অসাধু শিকারীর চোরাদৃষ্টিতে মহেশখালীর জীব বৈচিত্র্য হারিয়ে যেতে বসেছে। বর্তমানে (২০১০) হরিণ, বানর, গুটিকয়েক সাপ আর শীতের মৌসুমে অল্প কিছু পরিযায়ী পাখি চোখে পড়ে। মৈনাকপর্বত তো রইলোই ।এছাড়া রয়েছে রাখাইল পল্লী এবং সেখানে বৌদ্ধ মন্দীর।

দ্বীপটি লবন ও পান ব্যবসার প্রধান কেন্দ্র । যেটা শুরুতে বলেছিলাম। মহেশখালীর পান পান চাষ এখানকার ঐতিহ্যবাহী পেশা । তাই এখানে এলে পান খেতে একদম ভুলবেন না একেবারে। সামুদ্রিক মাছ ধরা চিংড়ি চাষ এবং তা প্রক্রিয়াজাতকরণ এই দ্বীপের একটি বিকাশমান শিল্প। শুষ্ক মৌসুমে সামুদ্রিক শুটকির জন্য দেশী-বিদেশী ব্যবসায়ীদের ভীর জমতে দেখা যায় এই দ্বীপে।

থাকার ব্যবস্থাঃ মহেশখালিতে থাকার তেমন ভাল ব্যবস্থা নেই । বরং কক্সবাজার এ ভাল হোটেল এ থেকে দিনে এসে এখানে ঘুরে যেতে পারবেন। কেননা কক্সবাজার থেকে

যাওয়ার উপায়ঃ  মহেশখালীতে যাওয়ার পথ দুটি। সড়ক পথে চকরিয়া থেকে বদরখালি হয়ে মহেশখালি অথবা কক্সবাজার থেকে ট্রলার বা স্পিড বোডে। মহেশখালির মধ্যে সড়ক পথে বদরখালিতে নদীর মতো চ্যানেলের ওপর সেতু তৈরি হয়ে গেছে ফলে এই পথ দিয়ে নৌপথে পাড়ি দেবার দরকার নেই। চকরিয়া হয়ে যাবার পথে চোঁখে পরবে “মহেশখালি জেটি”। এটি একটি ব্রীজ এবং দৈর্ঘ্যে বেশ লম্বা। এর চারপাশে প্রচুর জলাভুমি আর পেরাবন। যেখানে প্রচুর অতিথী পাখি আসে। এসব দেখে চোঁখের ক্লান্তি অনেকটাই দুর হয়ে যাবে। আসতে মাত্র দের ঘন্টা সময় লাগে।

You might like