ঘুরে আসুন রাস্তা বিহীন শহর থেকে 16/03/2016



যারা যারা ঢাকা শহরের জ্যামে পরেছেন তারা হয়তো মনে মনে ভেবেছেন যদি রাস্তা না থাকতো,যদি গাড়ি না থাকতো,কতই না ভাল হত। কিন্তু এমন তো আর সম্ভব না। কারন গাড়ি না থাকলে যোগাযোগ ব্যবস্থার কি হাল হত। কিন্তু কখনও যদি শুনতে পারেন এমন এক শহর রয়েছে যেখানে কোন রাস্তাই নেই, যে শহরে সব রাস্তা পানি দিয়ে তৈরি। নিঃশ্চই খুব অবাক হবেন। কোনো যান্ত্রিক যানবাহন নেই। নেই কোনো যানজট, ভিড়ভাট্টা আর শহরের অবাক ব্যস্ততা। ভাবছেন এও কি সম্ভব! সম্ভব আর কেন সম্ভব তাই জেনে নিন-

ইউরোপের দেশ হল্যান্ডের ছোট্ট একটি শহর গেইথর্ন। শহরটির বাসিন্দারা যাতায়াতের জন্য সম্পূর্ণ নির্ভর করেন জলপথের ওপর। শহরের প্রতিটা বাড়ির সামনে দিয়ে পরিকল্পিতভাবে খাল কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে যাতে সবাই নৌকায় করে যাতায়াত এবং মালামাল পরিবহনের কাজটা সারতে পারেন। আর্থিক সক্ষমতা থাকার পরও শহরবাসীদের কারো গাড়ি কেনার উপায় নেই। কারণ কোনো রাস্তাই তো নেই গেইথর্নে।

নেদারল্যান্ডের রাজধানী আমস্টারডামের ৭৫ মাইল উত্তরের গিথুর্ন শহরে ১৮০টি কাঠের সেতুর মাধ্যমেও শহরের আন্তঃযোগাযোগ রক্ষা করা হয়। মালামাল পরিবহন, হেঁটে চলার জন্য ব্রিজগুলো বেশি ব্যবহৃত হয়। ভূমধ্যসাগরীয় ঔপনিবেশিকদের মাধ্যমে ১২৩০ সালের দিকে শহরটি গড়ে ওঠে। মূলত পিট সার বহনের জন্য শহরের চারপাশের লেকের মতো খালটি কাটা হয় উত্তর থেকে দক্ষিণে।

আর গাড়ি নেই বলেই নেই কোনো কালো ধোঁয়ার ঝামেলা কিংবা হর্নের বিকট শব্দ। যদি নৌকায় চড়তে ভালো না লাগে তাহলে একটি সরু গলিপথ আছে শহরটিতে। সে পথে সাইকেল চালিয়ে কিংবা হেঁটে এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি যাতায়াত করা যায়। শহরটির পোস্টম্যানও একটি ছোট নৌকায় করে এবাড়ি ওবাড়িতে চিঠি বিলি করেন।

সৌন্দর্য ও রোমান্টিকতার জন্য শহরটিকে ‘ডাচ ভেনিস’ বলা হয়ে থাকে। এমন সুন্দর শহরকে নৌকায় বা হেঁটে আবিষ্কারের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে কে না চাইবে। ২৬০০ জনসংখ্যার এই শহরটি কিছুদিন আগেও একটি গ্রাম ছিল। কিন্তু পর্যটন খাতে এই ছোট্ট গ্রামটির অংশগ্রহণের কারণে গ্রামটিকে ছোট্ট শহরের মর্যাদা দেয় কর্তৃপক্ষ।

জলপথের শহর বলেই প্রতিবছর গেইথর্নে অনেক পর্যটক বেড়াতে আসেন। ১৯৫৮ সালে ডাচ চলচ্চিত্র নির্মাতা বার্ট হ্যান্সট্রা তাঁর বিখ্যাত হাসির ছবি ফানফেয়ার শুটিংয়ের জন্য গেইথর্নকে বেছে নিয়েছিলেন। এর পরই মূলত প্রচারের আলোয় এসেছিল তখনকার ছোট্ট গ্রামটি। তারপর এই শহরে আরো অসংখ্য সিনেমার শুটিং হয়েছে। পর্যটকরা শহরটিকে ভেসিন অব নর্থ কিংবা ভেনিস অব নেদারল্যান্ডস নামে ডাকতে ভালোবাসেন।

গেইথর্ন গ্রামের বাসিন্দা রোজেন বলেন, ‘আমরা আমাদের গ্রামকে খুবই ভালোবাসি। রাস্তা নেই বলে আমাদের কোনো সমস্যা হয় না। বরং আমরা এই ব্যাপারটাকে উপভোগ খুব করি।

খালের পানি কীভাবে এতটা পরিষ্কার থাকে; এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমাদের গ্রামের ছেলেবুড়ো সবাই যথেষ্ট সচেতন। আমরা এই পানিতে কোনো কিছু পরিষ্কার করি না। গোসল করাও একেবারেই নিষেধ। যন্ত্রচালিত নৌকা থেকে তেল নিঃসরণ হয় তাই ওই নৌকা আমাদের এখানে নিষিদ্ধ।’

শহরটি বিশাল প্রাকৃতিক সংরক্ষণশালা উইরিবেন উইডেন ন্যাশনাল পার্কের মাঝ বরাবর অবস্থিত। আর শহরটিকে ভালোভাবে পরিদর্শন করতে হলে নৌকায় চড়া বাঞ্ছনীয়।
স্থানীয় ছোট জনসংখ্যা ও কম পর্যটক গিথুর্ন শহরকে চিত্রানুগ করেছে। শহরের চারপাশের নিদ্রালু খাল পর্যটকদেরকে স্মৃতিকাতর করে তোলে।

অবশ্যই গ্রীষ্মকালে শহরটি বেড়ানোর জন্য জনপ্রিয় জায়গা। তবে শীতকালেও এটি সমান জনপ্রিয় কারণ সেসময় পর্যটকরা স্থানীয় খাল ও হৃদগুলোতে আইস স্কেটিং করতে পারে।

পর্যটকরা এখানে নৌকা নিয়ে ঘুরতে পারেন, শহরের ইতিহাস ঐতিহ্য জানার জন্য জাদুঘর পরিদর্শন, চিত্র প্রদর্শনীতে যেতে পারেন। বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে শীতকালে গিথর্নের খালে বরফ জমায় স্কেটিং করার সুযোগও পান পর্যটকরা। শান্ত, সাবলীল, শান্তির জীবনযাপনের জন্য গিথর্নের মতো স্বপ্নশহরই নিশ্চয় মানুষের প্রথম পছন্দ।

You might like